বাংলা ট্রিবিউন
নিজেই প্রতারণা করে উল্টো অভিযোগ: নেপথ্যে ডিবি কর্মকর্তাদের ‘রেষারেষি’?

নিজেই প্রতারণা করে উল্টো অভিযোগ: নেপথ্যে ডিবি কর্মকর্তাদের ‘রেষারেষি’?

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন  ডিসি’র (উপ-পুলিশ কমিশনার) বিরুদ্ধে জোর করে সাড়ে তিন কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন জসিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় চলছে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে। ইতোমধ্যে এই ঘটনা অনুসন্ধানে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে। তবে কমিশনারের দফতর থেকে কমিটি গঠন না করে গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় একজন প্রতারককে গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে তিনি ভুক্তভোগীকে প্রতারণার অর্থ ফেরত দিয়েছেন। কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগত অনুরাগের বশবর্তী হয়ে প্রতারককে ব্যবহার করে অধস্তন কর্মর্তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। *অভিযোগে যা বলা হয়েছে* সম্প্রতি জসিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি অভিযোগে বলেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ডিসি আব্দুল আহাদের নেতৃত্বে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল মালিবাগের ডায়না হোটেল থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে একটি সাজানো মামলা দিয়ে ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে সাড়ে তিন কোটি টাকার একটি চেক নেওয়া হয়। জসিম উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, তাকে গ্রেফতারের পর ডিবির কর্মকর্তারা তার স্ত্রীকেও বাসা থেকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসে। সাড়ে তিন কোটি টাকার চেক না দিলে স্ত্রীকেও জেলে পাঠানোর হুমকি দেয়। পরে তার এক চাচার মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। আদালতে দুই পক্ষের উকিলের মাধ্যমে বসে একটি আপসনামার মাধ্যমে তিনি জামিনে কারামুক্ত হন। আদালতে তার কাছ থেকে জোর করে চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। *আসল ঘটনা কী?* আলোচিত এই অভিযোগ সম্পর্কে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এবং বাদী-বিবাদীসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, মানস দাস নামে এক ব্যক্তির কাছে শুল্কমুক্ত স্বর্ণ বিক্রির কথা বলে মোট চার কোটি ১০ লাখ টাকা নেন জসিম উদ্দিন। গত ৯ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী সামাদ মার্কেটের মুজাহাব জুয়েলার্সে বসে প্রথমে নগদে ২০ লাখ টাকা নেন। পরবর্তীতে ১৪ সেপ্টেম্বর উত্তরার সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে বাকি তিন কোটি ৯০ লাখ টাকা নেন। প্রতারণার শিকার জুয়েলারি ব্যবসায়ী মানস দাস জানান, টাকা পরিশোধের পর থেকেই জসিম উদ্দিনের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। এক পর্যায়ে স্বর্ণ দিতে কালক্ষেপণ করায় তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বলে বুঝতে পারেন। পরবর্তীতে আদালতের একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু আদালত থেকে ঘটনাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে তদন্ত দেওয়া হলে একদিন পরই তিনি মামলাটি তুলে নেন। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে প্রতারিত হওয়ার বিশদ বর্ণনা দিয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। একই সঙ্গে গত ১৩ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর ৫৩। মামলা দায়ের হওয়ার পরপরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগের একটি দল তাকে মালিবাগের ডায়না হোটেল থেকে গ্রেফতার করে। মানস দাস বলেন, ‘আমি যে নিজের হাতে জসিম উদ্দিনের সহযোগী নিজামুলের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়েছে সিটি ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজেও তার প্রমাণ রয়েছে। ব্যাংক থেকে সেসব সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহে আছে।’ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জসিম উদ্দিনকে গ্রেফতারের পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে আদালতে সোপর্দ করে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এসময় তার মোবাইল ফোনে অসংখ্য স্বর্ণের বারের ছবি ও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে স্বর্ণের বার বিক্রির বিষয়ে কথপোকথনের রেকর্ড পাওয়া যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বর্ণের বার বিক্রির কথা বলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার কথাও স্বীকার করেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় এক দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। বাদী ও বিবাদী তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে ঘটনাটি মীমাংসা করেছে। এমনকি আসামি জসিম উদ্দিন আদালতের মাধ্যমেই বাদীকে তিন কোটি ৬০ লাখ টাকার চেক দিয়েছে। এখানে ডিবি পুলিশের কোনও হস্তক্ষেপ ছিল না। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ ডিসেম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারাহ দিবা ছন্দা শর্ত সাপেক্ষতে আসামি জসিম উদ্দিনকে জামিন দেন। আদালত তার আদেশনামায় বলেছেন, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে আসামির বিরুদ্ধে ৪০৬/৪২০ পেনাল কোড  সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৩/২৪/২৫ ধারার অভিযোগ উঠেছে। নথি ঘেঁটে দেখা যায় বাদী আদালতে স্ব-শরীরে হাজির হয়ে আপসনামা দাখিল করে আপসের শর্তে আসামি মুক্তি পেলে তার কোনও আপত্তি নাই বলে জানান। বাদীর পাওনাকৃত ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার স্বাক্ষরিত চেক বাদীর নিয়োজিত আইনজীবী আবরার খান তসলিমের জিম্মায় দেওয়া হলো। সার্বিক বিচেনায় একজন আইনজীবী ও একজন স্থানীয় ব্যক্তির জিম্মায় ২ হাজার টাকা বন্ডে আসামির জামিন মঞ্জুর করা হলো। আইনজীবী আবরার খান তসলিম বলেন, ‘আদালত নিজে আমার হেফাজতে চেকটি দিয়েছেন। আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে জসিম উদ্দিন আইনজীবীর উপস্থিতিতে আপসনামা ও চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এখানে জোর করার কোনও সুযোগ নাই। তার আইনজীবী ও তার স্ত্রীর উপস্থিত ছিলেন। আদালত চেক দেওয়ার শর্তেই তার জামিন মঞ্জুর করেছেন।’ *যেভাবে প্রতারণা করেন জসিম* মামলার নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত এই ঘটনার অভিযোগকারী জসিম উদ্দিন একজন পেশাদার প্রতারক। তিনি আরসিডি (রয়েল চিটিং ডিপার্টমেন্ট) গ্রুপের সদস্য। তার বিরুদ্ধে খুলনার পাইকগাছায় থানায় সীমান্ত পিলার সংক্রান্ত প্রতারণার একটি মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি প্রতারণা করার পর নিজ বাসায় অবস্থান করতেন না। তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে মালিবাগের একটি আবাসিক হোটেলে পলাতক থাকা অবস্থায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, জসিম উদ্দিন স্বর্ণের বার, সীমান্ত পিলার ও কষ্টি পাথর বিক্রির নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। মানস দাসের কাছ থেকে তিনি একই কৌশলে শুল্কমুক্ত স্বর্ণের বার বিক্রির নাম করে অর্থ নেন। প্রতারণার কৌশল হিসেবে তিনি তার সহযোগী নিজামুল হোসেনের অ্যাকাউন্টে প্রথমে তিন কোটি ৯০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে নিজামুল হোসেনের অ্যাকাউন্ট থেকে তিন কোটি ৭৪ লাখ টাকা জসিম উদ্দিন তার আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার নিজের একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। আবার সেখান থেকে একই দিনে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকে স্থানান্তর করে ব্র্যাক ব্যাংকের আশকোনা শাখায় স্থানান্তর করে আনেন। নিজামুল হোসেন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও জসিমের হয়ে তার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা নেওয়া এবং পরবর্তীতে জসিমের আল আরাফা ব্যাংকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখায় স্থানান্তর করার কথা স্বীকার করেন। তিনি জসিমের প্রতারণার বিষয়টি জানতেন না বলে দাবি করেন। সাক্ষী হিসেবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জিয়াসমিন আক্তার জাহান মেঘলা বলেন, আসামি জসিম উদ্দিন তাকে শুল্কমুক্ত স্বর্ণের ব্যবসার জন্য গ্রাহক খুঁজতে সহায়তা করতে বলেন। তিনি এক ব্যক্তির মাধ্যমে জুয়েলারি ব্যবসায়ী মানস দাসের সঙ্গে জসিমের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলেও স্বীকার করেন। তবে তিনি জসিম যে একজন প্রতারক এ বিষয়ে জানতেন না বলে দাবি করেন। প্রতারণার বিষয়ে জানতে অভিযোগকারী জসিম উদ্দিনের নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার আইনজীবী রানী বেগম বলেন, ওপেন কোর্টে আমার মক্কেল আপসনামায় স্বাক্ষর করেছেন। আইনজীবী হিসেবে আমি নিজেও সেখানে স্বাক্ষর করেছি। এখানে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কোর্টের মাধ্যমে আমার মক্কেল জসিম উদ্দিন চেকটি বাদীপক্ষকে হস্তান্তর করেছেন। *নেপথ্যে ডিবি কর্মকর্তাদের রেষারেষি* একজন ভুক্তভোগীকে সহায়তা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসামি গ্রেফতার এবং আদালতের মাধ্যমে প্রতারণার অর্থ হস্তান্তরের পরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, এর পেছনে আছে ডিবি কর্মকর্তাদের রেষারেষি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচিত এই ঘটনাটি অনুসন্ধানের জন্য প্রথমে একজন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হওয়ায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ওয়ারী বিভাগকে ঘটনা অনুসন্ধান ও প্রতারককে গ্রেফতারের জন্য নির্দেশনা দেন। এতে ডিবির এক সিনিয়র কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হন। এজন্য তিনি ওয়ারী বিভাগের কর্মকর্তাদের ফাঁসানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল করেছেন। সূত্র জানায়, বিষয়টি নিযে ডিবির ক্ষুব্ধ একটি পক্ষ ডিএমপি কমিশনারের কাছেও মৌখিক অভিযোগ দিয়েছেন। ডিএমপি কমিশনার বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করছেন। এদিকে জসিমের সঙ্গে তার স্ত্রীর কথপোকথনের একটি অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করেছে এই প্রতিবেদক। ওই কথপোকথনে জসিমের স্ত্রী বলছেন, ওরা ৪০ লাখ টাকা নিবো। ৪০ লাখ টাকা নিলে বাকি টাকা তুমি তোমার অ্যাকাউন্ট থেকে তুইল্যা নিতে পারবা। উল্লেখ্য, আদালতের নির্দেশে জসিমের অ্যাকাউন্ট বর্তমানে ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে।
Published on: 2023-12-26 11:14:55.323525 +0100 CET

------------ Previous News ------------