বাংলা ট্রিবিউন
নৌকা ও লাঙ্গলের বিপক্ষে আওয়ামী লীগ নেতারা, বিব্রত ত্যাগীরা

নৌকা ও লাঙ্গলের বিপক্ষে আওয়ামী লীগ নেতারা, বিব্রত ত্যাগীরা

বগুড়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনে ‘চেইন অব কমান্ড’ না থাকায় দায়িত্বশীল নেতারা শুধু শরিক দলের নৌকা ও লাঙ্গলের নয়; কাজ করছেন নিজ দলের প্রার্থীর বিপক্ষেও—এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। এতে কয়েকটি আসনে প্রার্থীদের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে। এসব ঘটনায় ত্যাগী নেতাকর্মীরা বেশ বিব্রতবোধ করছেন। তারা এ ব্যাপারে দলের হাইকমান্ডের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অন্যথায় আসনগুলো হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জানা গেছে, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে শিবগঞ্জ পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান মানিককে নৌকা দেওয়া হয়। বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনটি আদমদীঘি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম খান রাজু পান। এ ছাড়া বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসন দেওয়া হয় কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক পৌর মেয়র হেলাল উদ্দিন কবিরাজকে। বগুড়া-২ আসনে মানিক মেয়র পদ থেকে ও বগুড়া-৩ আসনে রাজু উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে সংসদ সদস্য প্রার্থী হন। এতে প্রার্থী ও সমর্থকরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শরিকদের সঙ্গে আসন সমন্বয়ের স্বার্থে বগুড়া-২ আসন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ এমপি, বগুড়া-৩ আসন জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম তালুকদারকে এবং বগুড়া-৪ আসনটি জেলা জাসদের সভাপতি এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনকে দেওয়া হয়। জিন্নাহ ও নুরুল লাঙ্গল ও তানসেন নৌকা প্রতীক নেন। কপাল পোড়ে চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করা রাজু ও মেয়র পদ থেকে সরে যাওয়া মানিকের। এ ঘটনায় বঞ্চিত আওয়ামী লীগের তিন নেতা ও তাদের সমর্থকদের মাঝে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। বগুড়া-৩ আসনে নৌকাবঞ্চিত সিরাজুল ইসলাম খান রাজুর ছেলে খান মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ আল মেহেদী স্বতন্ত্র প্রার্থী (ট্রাক) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন। আসনগুলোতে বঞ্চিত নেতারা গোপনে ও তাদের কর্মীরা প্রকাশ্যে শরিকদের ছেড়ে দেওয়া তিনটি আসনের নৌকা ও লাঙ্গল মার্কার প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তারা বগুড়া-২ আসনে লাঙ্গলের জিন্নাহর বিপক্ষে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (ট্রাক) জেলা বিএনপির সাবেক মহিলা বিষয়ক সম্পাদক বিউটি বেগমের হয়ে কাজ করছেন। বগুড়া-৩ আসনে শরিক জাপার নুরুল ইসলাম তালুকদারের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী আদমদীঘি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অজয় কুমার সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক খান মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ আল মেহেদীর হয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া বগুড়া-৪ আসনে শরিক জাসদের প্রার্থী এ কে এম রেজাউল তানসেনের (নৌকা) বিপক্ষে সাবেক বিএনপি নেতা ও চারবারের সাবেক এমপি ডা. জিয়াউল হক মোল্লার পক্ষে মাঠে রয়েছেন। আবার অনেকে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে নৌকা মার্কার প্রার্থী সাহাদারা মান্নান এমপির বিপক্ষে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত শাহাজাদী আলম লিপি (তবলা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমানের (ঈগল) পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বগুড়া-৬ (সদর) আসনে নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে গত ১ ফেব্রুয়ারির উপনির্বাচনে নয় মাসের এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুকে। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বগুড়া পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মান্নান আকন্দ (ট্রাক মার্কা)। জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী অনেক নেতা রিপুর পক্ষে মাঠে নেই। তারা ‘মহামিলনের’ নামে স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক মার্কার আবদুল মান্নান আকন্দের পক্ষে জোরালোভাবে কাজ করছেন বলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এ আসনে নৌকা মার্কার রিপুর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল মান্নানের সঙ্গে দায়িত্বশীল আওয়ামী লীগ নেতাদের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। যদিও নেতারা বলছেন, এটা তাদের নির্বাচনি মহামিলন নয়; অতীত বিরোধের অবসান। বগুড়া-২ আসনে তৌহিদুর রহমান মানিকের কাছ থেকে নৌকা কেড়ে নেওয়ায় তার পক্ষের আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। তারা জাপার জিন্নাহর পরিবর্তে বিএনপির সাবেক নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী বিউটি বেগমের ট্রাক মার্কাকে সমর্থন দিয়েছেন। দলীয় কার্যালয়ে সভার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিদুল ইসলাম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আহসান হাবিব সবুজ, দেউলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলামসহ অনেক দায়িত্বশীল নেতা। শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তা জানান, নৌকার প্রার্থী না থাকায় নেতাকর্মীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তারা জাপা প্রার্থীকে ভোট দেবেন না। এতে ভোট দেওয়ার বিষয়টি ওপেন করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়ায় সাবেক বিএনপি নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী বিউটি বেগম প্রকাশ্যে বলছেন, ‘তিনি শুয়ে থাকলেও ভোট পাবেন।’ বগুড়া-৪ আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক বিএনপি নেতা ডা. জিয়াউল হক মোল্লার পক্ষে কাজ করছেন। এখানে শরিক জাসদ প্রার্থী (নৌকা) এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনের পক্ষে কাজ করায় নন্দীগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন রানা ও সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান বুধবার নন্দীগ্রাম পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বকুল হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমানকে তাদের দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেন। এ ছাড়া তাদের শোকজও করেছেন। এর জবাবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ওই দুই নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা ডা. মোল্লার পক্ষে কাজ করায় নৌকা প্রার্থী জাসদ নেতা তানসেনের ভাগনে মিলন রহমানের মারপিটের শিকার হয়েছেন নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি রুবেল হোসেন, সহসভাপতি মোফাজ্জল হোসেন ও যুগ্ম সম্পাদক রুহুল আমিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর এ জেলায় ক্ষমতাসীন দলে ‘চেইন অব কমান্ড’ নেই। তিনি শুধু আওয়ামী লীগ নয়; সব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন এখানে কেউ কারও কথা শোনেন না, কেউ কাউকে মানেন না। শুধু ফটোসেশন ও সেলফির রাজনীতি চলছে। ভোটের প্রচারণাতেও একই অবস্থা। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে তারা সরকার বা শরিক দলের প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে বগুড়া জেলা মহিলা লীগের অবস্থা শোচনীয়। এ সংগঠন বিএনপি ঘরানার ও হাইব্রিডের দখলে। তারা ত্যাগী নেতাকর্মীদের কাজ করতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় মহিলা লীগকে অবহিত করা হলেও তারা কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। উপরন্তু অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় এক নেত্রী এ কোন্দলে সহযোগিতা করছেন। ফলে অনেক নারী রাজনীতিবিমুখ হচ্ছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীরা বলেন, ‘ওই সব নেতাদের এহেন কর্মকাণ্ডে আমরা বিব্রত। এ ব্যাপারে অবিলম্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ অন্যথায় সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে দুঃখ প্রকাশ করেন তারা।
Published on: 2023-12-29 05:11:08.092337 +0100 CET

------------ Previous News ------------