বাংলা ট্রিবিউন
নির্বাচনে কথিত ‘হস্তক্ষেপে’র অভিযোগ নিয়ে যা বলছে ভারত

নির্বাচনে কথিত ‘হস্তক্ষেপে’র অভিযোগ নিয়ে যা বলছে ভারত

বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপির প্রায় রুটিনে পরিণত করেছে এই অভিযোগ। রুটিনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে আগামী ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও প্রতিবেশী ভারতের ‘হস্তক্ষেপে’র অভিযোগ তুলেছে দলটি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এমনও মন্তব্য করেছেন– দিল্লিই না কি বাংলাদেশের মানুষের ‘ভাগ্য ছিনিয়ে নিয়েছে’! ভোটের যখন আর মাত্র কয়েকদিন বাকি তখন তাদের কথায় মনে হচ্ছে, বিএনপি আসলে তাদের ‘রাজনৈতিক ভুলের দায়’ ভারতের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে! দিল্লিতে কূটনীতিবিদ, গবেষক ও পর্যবেক্ষকরা প্রায় একবাক্যে বলছেন, বাংলাদেশের মানুষই গণতান্ত্রিক পন্থায় তাদের সরকার নির্বাচিত করে আসছে। সেখানে ভারতকে টেনে আনাটা ‘অত্যন্ত নিচু দরের সস্তা রাজনীতি’ ছাড়া আর কিছুই নয়! শুক্রবার (২৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যখন বিএনপির তোলা ওই অভিযোগ নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা কিন্তু সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি। বস্তুত মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী তখন সটান জানিয়ে দেন, ‘আপনারা বিএনপি-র মন্তব্য নিয়ে জানতে চাইছেন। আমি কিন্তু পরিষ্কার বলে দিতে চাই, এরকম কোনও রাজনৈতিক দল কী বললো, সেটায় আমরা মোটেই ঢুকতে চাই না।’ তবে সেই সঙ্গেই তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান আগাগোড়াই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর সেই অবস্থানটা হলো বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোপুরি সে দেশের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। অরিন্দম বাগচীর কথায়, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাগ্য কী হবে, তা সে দেশের মানুষই নির্ধারণ করবেন। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে আমরা শুধু চাইবো বাংলাদেশে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে এবং একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে তারা এগিয়ে যাবে।’ তবে এতো গেলো রুটিন বিবৃতি, যা মোটামুটি গত কয়েক মাস ধরেই ভারতের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে বলে আসা হচ্ছে। কিন্তু এর পাশাপাশি একান্ত আলোচনায় দিল্লিতে সরকারি কর্মকর্তারা যা বলছেন, তাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র তো এমনও বলছেন, ‘হস্তক্ষেপের কথাটাই তো হাস্যকর। ভারত কি বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনও প্রার্থী বা দলের হয়ে প্রচার করছে? কোনও দলকে জেতানোর জন্য বিবৃতি দিয়েছে? কিংবা কোনও দলের নির্বাচনি তহবিলে টাকা দিয়েছে?’ এগুলোর কোনোটাই যেহেতু হয়নি, তাই বিএনপির অভিযোগটাকেই ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছে দিল্লি। ওই সূত্রটি আরও জানাচ্ছেন, ‘আমাদের তো বরং মনে হচ্ছে বিএনপি এখন নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে পস্তাচ্ছে। ২০১৪তেও তারা একই ভুল করেছিল। আর এখন সেই ভুলের দায় ভারতের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ ২০১৪ সালের নির্বাচনের কিছুদিন আগে ভারতের সে সময়কার পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা ঢাকা সফর করেছিলেন, যেটাকে বাংলাদেশের এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যমেও ‘হস্তক্ষেপ’ বলে তুলে ধরা হয়েছিল। ভারতের সরকারি সূত্রগুলো সে প্রসঙ্গেও বলছেন, ২০১৪ সালের সেই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশে একটা ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা’, ভারত শুধু সেই লক্ষ্যেই কাজ করেছিল। ‘বিএনপি আসছে না বলে ক্ষমতাসীন দল যদি তখন নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিত, তখন তো আবার বলা হত তারা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে বসে আছে। এবারেও ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে’, বলছিলেন ওই কর্মকর্তা। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতা এম জে আকবরও বিশ্বাস করেন, ভারতকে এ ব্যাপারে দোষারোপ করাটা সম্পূর্ণ অর্থহীন। শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সমর্থনেই ক্ষমতায় টিকে আছে—এই তত্ত্বও তিনি একেবারেই মানতে রাজি নন। এম জে আকবর এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকারকে যদি কেউ ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখে, সেটা হলো বাংলাদেশের জনগণ। পরিসংখ্যান বলবে বাংলাদেশের মানুষের ভোটে জিতেই তিনি বারবার ক্ষমতায় ফিরেছেন, অন্য দেশ থেকে কেউ গিয়ে তার হয়ে ব্যালটে ছাপ মেরে আসেনি!’ ‘এখন সেই ভোটে বিএনপি আসবে কি না আসবে না, সেটা তো তাদের সিদ্ধান্ত। আর কোনও দল যদি একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তার ভালো বা মন্দের দায়ও তাদেরই নিতে হবে। অন্যের ঘাড়ে সেই দায় চাপানোটা কিছুতেই মানা যায় না’, বলছিলেন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ফরেন পলিসি সাময়িকীর কলামিস্ট মাইকেল কুগেলম্যানও রবিবার (৩১ ডিসেম্বর) প্রায় একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (থিংক ট্যাংক) উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের এই ডিরেক্টর নিজস্ব ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেছে একটা নীতিগত অবস্থান থেকে – কারণ তারা মনে করছে নির্বাচনে রিগিং হবে/ এই নির্বাচনে জেতা সম্ভব নয়, তাই তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করছে।’ ‘কিন্তু বিএনপির এই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগেরই সুবিধা করে দিচ্ছে ও তাদের নিজেদের স্বার্থে আঘাত করছে। কারণ তারা পরে এই দাবি করতে পারবে না যে আওয়ামী লীগ চুরি করে এই ভোটে জিতেছে, যেহেতু কোনও প্রতিপক্ষই ছিল না যার কাছ থেকে চুরি করা হবে!’ কাজেই মাইকেল কুগেলম্যান উপসংহার টেনেছেন ‘বিএনপির বয়কট = আত্মঘাতী গোল!’ ভারতেও সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বেসরকারি স্তরে যে বাংলাদেশ ওয়াচাররা রয়েছেন তারাও ঠিক এই যুক্তিই দিচ্ছেন, বিএনপি এখন বুঝতে পারছে তারা আবার একটা মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল করে ফেলেছে যা আগামী পাঁচ বছরেও শোধরানো সম্ভব নয়। আর তাই অযথা ভারতকে এই বিতর্কে টেনে এনে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
Published on: 2023-12-31 19:04:46.90645 +0100 CET

------------ Previous News ------------