বাংলা ট্রিবিউন
ব্রিটে‌নে বাংলাদেশিরা কেন পিছিয়ে

ব্রিটে‌নে বাংলাদেশিরা কেন পিছিয়ে

ব্রিটে‌নে বাংলাদেশি কমিউনিটির যাত্রা শুরুর শতবর্ষ পেরিয়েছে অনেক আগে। ষাটের দশক থেকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের জন্য বিলেতের বাংলাদেশিদের রয়েছে ঐতিহাসিক অবদান। নতুন আসা বাংলাদেশিসহ দেশ‌টি‌তে এখন প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশির বাস। কিন্তু, শত বছর প‌রেও ভারতীয়সহ অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় ও দেশ‌টি‌তে বসবাসরত অন্য অনেক এথ‌নিক মাইন‌রি‌টি কমিউনিটির তুলনায় দেশটিতে শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতির মূলধারা এমনকি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছেন বাংলাদেশিরা। লিভিং ওয়েজ ফাউন্ডেশন ও যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ওএনএসের সর্বশেষ জ‌রি‌পের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশি কর্মীরা লন্ডনে সবচেয়ে কম বেতনের দেশভিত্তিক কমিউনিটি। যারা লন্ডন লিভিং ওয়েজের চেয়ে ২৯ দশ‌মিক সাত শতাংশ কম উপার্জন করেন। যুক্তরাজ্যের ম্যাককিন্সির ইন্টারসেকশনাল এক্সপেরিয়েন্স রিপোর্টে উঠে এসেছে, শ্বেতাঙ্গ, ব্রিটিশ পুরুষদের তুলনায়, বাংলাদেশি মহিলাদের সবচেয়ে বেশি বেতনের বৈষম্য ছিল। স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রে ব্রিটে‌নে জাতিগত হি‌সে‌বে সবচেয়ে বেশি অসুস্থতায় ভোগা কমিউনিটির সূচ‌কে রয়েছেন বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিরা। ব্রিটে‌নে করোনায় মৃত্যু হারের তালিকা‌য়ও শী‌র্ষে ছি‌ল বাংলাদেশিরা। তবে আশার কথা হলো, ব্রিটে‌নে সাম্প্রতিক বছরগু‌লো‌তে স্কুল-ক‌লেজ থে‌কে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাফ‌ল্যের দ্যুতি ছড়াচ্ছেন বাংলাদেশিরা। ব্রিটে‌নে গত চার দশ‌কের বে‌শি সময় ধ‌রে শিক্ষকতা, সাংবা‌দিকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন ড. রেনু লুৎফা। তি‌নি ব‌লেন, বাংলাদেশিরা ব্রিটে‌নের মূলধারায় পৌঁছা‌তে প্রধান অন্তরায় আমা‌দের মানসিকতা। আমা‌দের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতার অভাব। দূরদৃষ্টির অভাবের কারণে আউটলুকের গণ্ডি খুব সীমাবদ্ধ। ভারতীয়দের বা অন্যান্য দক্ষিণ এশীয়‌দের তুলনায় ব্রিটে‌নে আমরা অনেক পিছিয়ে কারণ আমরা শিখ‌তে চাই না,পড়‌তে চাই না। এদে‌শে এসে যে সড়কে দু‌টো মস‌জিদ আছে সেখানে আরেকটা মস‌জিদ বানা‌নো, সেই মস‌জিদ ক‌মি‌টির সভাপ‌তি হওয়া থা‌কে লক্ষ। ব্রিটে‌নের মূলধারার লেবার বা কনজার‌ভে‌টিভ পা‌র্টির রাজনীতি না ক‌রে বাংলাদে‌শের বিএন‌পি-আওয়ামী লী‌গের রাজনীতিতে মত্ত। নিজ গ্রা‌ম, ইউনিয়ন, উপ‌জেলার না‌মে একা‌ধিক সংগঠন ক‌রে সেই সংগঠ‌নের সভাপ‌তি-সম্পাদক হওয়া য‌দি বাংলাদেশি কমিউনিটির যাত্রা শুরুর একশ বছর পরে আমা‌দের টার্গেট থা‌কে তাহলে এগোবে কোন প‌থে। বাংলাদেশিদের ব্রিটে‌নের মূলধারার রাজনী‌তি‌তে অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা নি‌য়ে মন্তব্য কর‌তে গি‌য়ে টাওয়ার হ‌্যাম‌লেটস কাউ‌ন্সি‌লের সা‌বেক ডেপু‌টি মেয়র ও বর্তমান কাউন্সিলর অহিদ আহমদ ব‌লেন, ব্রিটে‌নে বাংলাদেশি কমিউনিটির শতবর্ষের ইতিহাসে নিজ দেশের অনুকরণীয় বিতর্কহীন রোল ম‌ডেল কোনও নেতা উঠে আস‌তে পারেননি। প্রতিহিংসা, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা এর একটা বড় কারণ। নিজ দেশের এক ভাইকে সাহায্য করার চে‌য়ে পি‌ছি‌য়ে দেবার অসংখ‌্য উদাহরণের কারণে ব্রিটে‌নে বাংলাদেশিদের নতুন প্রজন্ম রাজনী‌তি‌তে অনাগ্রহী। ব্রিটে‌নে মূলধারার রাজনী‌তি‌তে সান্ধ্যকালীন পা‌র্টির পরিবেশের সাথে আমা‌দের অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ তাল মেলা‌তে পারেন না ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে। লন্ডনের নিউহাম কাউন্সি‌লের সি‌ভিক মেয়র ও চারবা‌রের কাউন্সিলার র‌হিমা রহমান ব‌লেন, নি‌জের আগ্রহ, ইচ্ছাশক্তি পরিবারের অনুপ্রেরণা থাকলে বাংলাদেশি নারীরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সাম‌নের সারি‌তে নি‌য়ে আসতে পা‌রেন। নতুন প্রজ‌ন্মের অনেকে রাজনী‌তির মূলধারায় আস‌ছেন। আগামী দুই দশ‌কে ব্রিটেনের মূলধারার রাজনী‌তি‌তে ব্রিটিশ বাংলাদেশি প্রজ‌ন্মের অংশগ্রহণ অনেকগুণ বাড়‌বে বলে আমার প্রত্যাশা। ব্রিটিশ সমাজে একীভূত হতে নবাগত বাংলাদেশি ও জন্মসূত্রে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা কেন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, ভাষা, সংস্কৃতি ও কাজসহ আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষ‌য়ে আর কীভাবে এসব বাধা অতিক্রম করা যায় ‌সে সম্প‌র্কে ব্রিটে‌নে চার দশক শিক্ষকতা পেশায় থাকা বর্ষীয়ান শিক্ষা‌বিদ, ক‌বি ফ‌রীদ আহমদ রেজা ব‌লেন, ব্রিটেন এমন একটি দেশ যে দেশ আবহাওয়া, ভাষা, ধর্ম, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বিচারে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরুর দিকে বাংলাদেশ থেকে যারা এখানে এসেছেন তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কিছু পাউন্ড জমিয়ে একসময় দেশে ফিরে যাওয়া। তাদের সিংহভাগের লেখাপড়া তেমন ছিল না। তারা দু-বছর পর কিছু পাউন্ড হাতে নিয়ে দেশে যেতেন। সেখানে দু-বছরের কম সময় থেকে আবার এ দেশে চলে আসতেন। তাদের অধিকাংশ মানুষ এ দেশের সমাজ-জীবনে কোনও ভূমিকা রাখা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। বর্তমানে এ অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সংখ্যায় কম হলেও অনেক বাংলাদেশি এ দেশের শিক্ষা, রাজনীতি ও সমাজ-জীবনে অবদান রাখছেন। তারা আরও বেশি অবদান রাখতে পারতেন যদি আমরা আমাদের ছেলেমেয়ের পেছনে আরও বেশি সময় ব্যয় করতে এবং সুন্দর জীবন গড়ার পথে বাস্তব দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাদের উৎসাহ দিতে পারতাম। বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের মধ্যে অনুসরণের মতো তেমন কাউকে পায় না। বাংলাদেশি রাজনীতি, আঞ্চলিক-সামাজিক সংগঠন, গ্রাম্য দলাদলি ইত্যাদি নিয়ে আমাদের কমিউনিটির নেতারা রাত-দিন ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব তারা কিছুটা এককভাবে মায়ের উপর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্কুলশিক্ষক ও ছেলেমেয়ের বন্ধুদের উপর ছেড়ে দিয়ে রাখেন। আমরা এতই ব্যস্ত যে ছেলেমেয়ের সাথে খেলাধুলা এবং কোয়ালিটি-টাইম ব্যয় করার অবসর আমাদের নেই। ছেলেমেয়েকে এ দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে উচ্চতর ভূমিকা পালনের জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যে রকম পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন সেটাও আমাদের ছেলেমেয়ে সঠিকভাবে পায় না। আমরা অনেকে আমাদের স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনকে বঞ্চিত করে বাংলাদেশের জীবনকে জাঁকজমকের সাথে সাজানোর জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করি। বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়ে এ দেশকে তারা নিজেদের দেশ এবং এ দেশকেই তাদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে বা নেবে। কিন্তু আমরা অনেকে এ দেশকে নিজের দেশ হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারিনি। আমার মতে এটাই বাংলাদেশি সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমাদের ছেলেমেয়েরা এটা বুঝে, একবিংশ শতকের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে লড়াই করে তাদের টিকে থাকতে হবে। সে লড়াইয়ের জন্য আমরা আমাদের ছেলেমেয়েকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাবা-মাকেই বেশি দায়ী করবে। তাই ছেলেমেয়ের পেছনে সময় দিতে হবে, তাদের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হবে, তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিভিন্ন কৌশলে জাগ্রত করতে হবে, তাদের সাথে নিয়মিত কথা বলতে হবে, কোনও সন্তানের প্রতিভা কোন কাজের জন্য যোগ্য তা সঠিকভাবে যাচাই করে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশি রাজনীতি এবং কমিউনিটি রাজনীতির চেয়ে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের বেশি সময় দিতে হবে বলে মনে করেন ফ‌রীদ আহমদ রেজা।
Published on: 2023-12-31 08:31:12.849934 +0100 CET

------------ Previous News ------------