বাংলা ট্রিবিউন
ঠান্ডা বা গরম পানি যখন আতঙ্ক

ঠান্ডা বা গরম পানি যখন আতঙ্ক

গত ২ ডিসেম্বর বেলা আড়াইটার দিকে ছেলেকে গোসল করানোর জন্য রান্নাঘর থেকে গরম পানি নিয়ে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে ছেলে আচমকা দৌঁড়ে আসলে আমার সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে গরম পানি ছলকে পড়ে ঝলসে যায় ছেলের পিঠের অনেকটা অংশ। পাশের বাসায় কাপড় ধোয়ার জন্য গরম পানি করে রুম থেকে বের হচ্ছিলেন একজন। রুমের দরজায় পর্দা ঝুলছিল। ওদিক থেকে যে শিশুটি দৌঁড়ে ঢুকতে যাবে বুঝা যায়নি। দুজনে ধাক্কা লেগে গরম পানি পড়ে ঝলসে গেছে শিশুটির পুরো মুখ। বাথরুমে কলের নিচে বালতিটা দিয়ে ভরার অপেক্ষা করছিলেন আকলিমা। এ সময় ভাত নামাতে রান্না ঘরে যান তিনি। দুই বছরের রায়হান বাথরুমে বালতির পানিতে খেলতে-খেলতে একপর্যায়ে উল্টে বালতির মধ্যে পড়ে যায়। ভাত নামিয়ে রান্নাঘর থেকে বাথরুমে ফিরে মা দেখেন বালতির মধ্যে ছেলের নিথর শরীর। গরম কিংবা ঠান্ডা পানি— সবখানেই শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা। সামান্য সতর্কতা পালন করলে হয়তো এই দুর্ঘটনাগুলো এড়ানো যেতো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, কিশোরদের মধ্যেও পানিতে ঢুবে মারা যাওয়ার হার বাড়ছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের মতে, শীতে গোসলের জন্য বেশিরভাগ মানুষ গরম পানি করেন শিশুকে গোসল করানো বা নিজে গোসল করার জন্য। এসময় অসতর্কতায় ঘটে দুর্ঘটনা। এজন্য মায়েদের এবং পরিবারের সদস্যদের উচিত সতর্কতার সঙ্গে গরম পানি ব্যবহার করা। অপরদিকে গরম পানি এবং গরম খাবারও সচেতনতার সঙ্গেই ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া গরম পানির পাত্র হাত ফসকে গিয়ে যে কারও গায়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে বয়স্ক ও শিশুরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার সম।বাবনা থাকে। বার্নের ঘটনায় মৃত্যু সংখ্যা বেশি না হলেও ডুবে যাওয়া শিশুদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। বাংলাদেশ পুলিশের প্রশাসনিক প্রতিবেদনের উদাহরণ টেনে ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউকে বলেন,  ‘২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়— এ সময়ে মোট ১০ হাজার ২৮৭টি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা পুলিশের কাছে রেকর্ড করা হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, পানিতে ডুবে প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের (১৮ বছর অনুর্ধ্ব) মৃত্যুর হার প্রায় সমান সমান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— পানিতে ডুবে অনুর্ধ্ব ৬ বছর বয়স্ক শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা মোট মৃত্যুর ২০ শতাংশের বেশি। ফলে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে পানির বিষয়ে সতর্ক থাকা তার আশেপাশের মানুষদের জন্য জরুরি। এদিকে গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’র হিসাবে, ২০২০ থেকে ২০২২— এই তিন বছরে পানিতে ডুবে ৩ হাজার ২৮৫ জন মারা গেছে। এদের মধ্যে ৮৭ শতাংশই শিশু। সমষ্টির এ হিসাব শুধু সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাস্তবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ড্রাউনিং প্রিভেনশনের (এনএডিপি) আহ্বায়ক সদরুল হাসান মজুমদার মনে করেন, অভিভাবক ও কেয়ার গিভারদের সচেতন করা না গেলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেওয়া কোনও উদ্যোগ কাজে আসবে না। তিনি নিজের পরিবারের এক শিশুর গরম পানিতে পড়ে যাওয়ার বিষয়ে বলেন, ‘পারিবারিক কোনও অনুষ্ঠানে যখন অনেক মানুষের আনাগোনা হয়, তখন অবশ্যই শিশুর সঙ্গে সার্বক্ষণিক একজনকে রাখা জরুরি। ৫ বছরের নিচের শিশু এবং বয়স্কদের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।’ পুড়ে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিতে হবে বলার আগে আবারও কেবল সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শীতকালে আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। বাড়িতে আমরা গরম পানিসহ যেসব গরম তরল জিনিস ব্যবহার করি, তার কারণে ঘরের ভেতরের দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি  হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভিকটিম হয় শিশুরা। পাশাপাশি বিদ্যুতায়িত হয়ে বার্নের ঘটনাও ঘটছে। আমাদের এখানে এমন রোগীও আসছে। আমরা যদি গরম তরল জিনিস ব্যবহারে সচেতন হই, তাহলে এধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।’ চিকিৎসা দিয়ে এসব রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যাদের সুস্থ করা যায় তাদের আগের অবস্থায় ফেরানো যায় তা বলবো না। তাই সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সচেতনতা।’
Published on: 2024-01-13 19:06:00.167469 +0100 CET

------------ Previous News ------------