বাংলা ট্রিবিউন
‘শীতের কষ্ট গায়ে সইলেও পেটে সয় না’

‘শীতের কষ্ট গায়ে সইলেও পেটে সয় না’

শীতে কাঁপছে দেশ। কনকনে বাতাসে কাবু সাধারণ মানুষ। উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহে জবুথবু হয়ে আছে পুরো জনপদ। রাজধানী ঢাকাতেও বেড়েছে শীতের তীব্রতা। এতে করে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এতে করে দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। রবিবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় কথা হচ্ছিল রিকশাচালক মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘শীতের কষ্ট গায়ে সইলেও পেটে সয় না। একদিন কাজে না বের হইলে পেট চালানো মুশকিল। এমন শীতে রিকশা চালাইতেও হাত পা অবশ হয়ে আসে। গরিব হয়ে আছি বিপদে; আমাদের শীতও আটকায় না, পেটও মানে না।’ সংসার চালাতে তীব্র শীত উপেক্ষা করেও রিকশা নিয়ে বেরিয়েছেন মকবুল হোসেন। কিন্তু শীতের কারণে মানুষ খুব একটা রিকশায় উঠছে না। এতে করে শীতে কষ্ট করলেও কাঙ্খিত আয় হচ্ছে না তার। এর বাইরে রাজধানীর ছিন্নমূল মানুষের কাছে এই শীত রীতিমতো আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। ঘরহীন এসব মানুষ সাধ্যমতো গরম কাপড় যোগাড় করে রাস্তার পাশে, ফুটপাতে, ফুটওভার ব্রিজে কিংবা রেলস্টেশনে ঘুমালেও কোনোভাবেই শীত কমে না তাদের। রাজধানীর হাইকোর্ট মাজার এলাকায় রাস্তার পাশে শুয়েছিলেন বায়েজিদ নামের একজন। তিনি জানান, মাঝেমধ্যে বিত্তবানরা দুয়েকটা কম্বল দিয়ে যান। সেগুলো মুড়িয়েই কোনোভাবেই শীত নিবারণ করার চেষ্টা করেন তারা। তবে এখন যে শীত পড়ছে এসব কম্বলে তা কমাতে পারে না। রাতে শীতের প্রকোপে ঘুমাতেও পারেননি বায়েজিদ। তিনি বলেন, ‘বরফের মত শীত পড়ছে। তিন-চারটা লেপ কম্বল গায়ে দিয়েও পুরো শরীর জমে যাচ্ছে। কুয়াশার চাইতেও মাটি থেকে উঠে আসা ঠান্ডার কারণে ঘুমানো যায় না। রোদ উঠলে একটু আরাম করে ঘুমাতে পারবো।’ এদিকে শীতের কারণে একেবারেই আয় হারিয়ে বসেছেন বুড়িগঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে নৌকা পারাপার করা মাঝিরা। রবিবার সকাল ১০টার দিকেও বুড়িগঙ্গার খোলামোড়া ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে নৌকার উপরেই শুয়ে আছেন মাঝিরা। ঘাটে নৌকা দিয়ে লোক পারাপার করা সেলিম মাঝি জানান, শীতের কারণে খুব কম মানুষই নদী পার হচ্ছেন। এ কারণে অন্যান্য দিন সকাল থেকে অনেকবার খেয়া পার করতে পারলেও গত দুদিন যাত্রীর সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সেলিম মাঝি বলেন, ‘যেভাবে শীত পড়ছে দুইবার বৈঠা মারলে হাত অবশ হয়ে যায়। আবার মানুষ কম হওয়ায় ভাড়াও আসে কম। সব মিলিয়ে না পোষাতে পেরে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা ছাড়া উপায় নাই।’ ছিন্নমূল এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সাজিদা ফাউন্ডেশনের ২০২২ সালের তথ্যমতে ঢাকা শহরে দিনমজুর, নিম্নআয়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এছাড়া ফুটপাত ও রাস্তাঘাটে ঘুমানো ঘরহীন মানুষের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। তীব্র শীতে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের প্রত্যেকেই কোনও না কোনোভাবে আয় ঘাটতিতে পড়ছেন। মূল ধারার বাইরের এসব মানুষকে সুরক্ষা দিতে প্রধানমন্ত্রীর আবাসন প্রকল্পসহ নানাবিধ উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিয়ে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজধানীর নিম্ন আয়ের এবং ছিন্নমূল মানুষদের মূলধারায় আনতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়ে সেবা সংস্থাগুলো এবং সরকারকে কাজ করতে হবে। তীব্র শীত কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না দিলে সামাজিক অপরাধ বাড়তে পারে।’
Published on: 2024-01-14 07:47:22.753343 +0100 CET

------------ Previous News ------------