বাংলা ট্রিবিউন
আলুক্ষেত নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

আলুক্ষেত নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

ঘন কুয়াশার কারণে বিভিন্ন জেলায় আলুক্ষেতে ছত্রাকজনিত পচন রোগ ‘লেটব্লাইট’ দেখা দিয়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এ অবস্থায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটালে মিলবে প্রতিকার। *জয়পুরহাট* জয়পুরহাটে গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ঘন কুয়াশার কারণে আলুক্ষেতে পচন রোগ দেখা দিয়েছে। ফলে গাছ মরে যাচ্ছে। ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটানোর পরও কাজ না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না বলে জানিয়েছেন তারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জয়পুরহাটে এবার ৩৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আলু চাষ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় আবাদ বেশি হয়েছে ২২৫ হেক্টর জমিতে। মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও এই মাসে হঠাৎ তাপমাত্রা নিচে নেমে যাওয়ায় শীত ও ঘন কুয়াশায় কোনও কোনও ক্ষেতে লেটব্লাইট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটালে কাজ হবে। আবহাওয়া ভালো হলে সমস্যা এমনিতেই কেটে যাবে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। জেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ আলু গাছের পাতা ও ডগা পচতে শুরু করেছে। কোনও কোনও গাছ শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, গাছগুলো কালো রঙ ধারণ করে শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেতের গাছ পচে যাচ্ছে। ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটালেও কাজ হচ্ছে না। কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের চাষি সুমন সরকার ও রফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর দুজনে পাঁচ-ছয় বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। আলু তোলার আগমুহূর্তে গাছে পচন রোগ দেখা দেওয়ায় শঙ্কিত তারা। আক্কেলপুরের চক্রপাড়া গ্রামের আব্দুস সালাম বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছি। এক লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাশাপাশি সার ও কীটনাশকে বিঘাপ্রতি আরও চার হাজার টাকা করে খরচ বেড়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে পচন রোগ দেখা দেওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’ ক্ষেতলাল উপজেলার বটতলি বাজারের এসিআই সিডের আলুবীজ ডিলার ও কৃষক দুলাল হোসেন সরদার বলেন, ‘৭৫ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আলু আবাদ করেছি। এখন অধিকাংশ ক্ষেতে পচন ধরে গাছ মরে যাচ্ছে। ছত্রাকনাশক ছিটালেও কাজ হচ্ছে না। উৎপাদন খরচ উঠবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।’ সাড়ে সাত বিঘা জমিতে বি়ভিন্ন জাতের আলু আবাদ করেছেন পাঁচবিবি উপজেলার শিরট্টি ভারাহুত গ্রামের কৃষক ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রায় সব জমির আলু গাছ মরে গেছে। এতে অনেক লোকসান হবে।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ রাহেলা পারভীন বলেন, ‘ঠান্ডা আবহাওয়া আলু চাষের জন্য উপকারী। কিন্তু একটানা ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহ এর জন্য ক্ষতিকর। কুয়াশা থাকলে আলুক্ষেত ছত্রাকে আক্রান্ত হয়। ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটালে কাজ হবে। পাঁচ-সাত দিন পর পর প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম সিকিউর অথবা ২ গ্রাম একরুবেট এমজেড প্লাস, অথবা ২ গ্রাম ডাইথেন এম, অথবা ২ গ্রাম মিলোডি ডিউ প্লাস স্প্রে করলে সফলতা পাওয়া যাবে।’ সচেতনতার অভাবে কৃষকরা ওষুধ সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হন উল্লেখ করে এই কৃষিবিদ বলেন, ‘কৃষকদের সচেতন করার লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ মাঠপর্যায়ে চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। সেইসঙ্গে কৃষি সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার জন্য কৃষকদের উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।’ *নওগাঁ* ঘন কুয়াশার কারণে নওগাঁর বিভিন্ন আলুক্ষেতে লেটব্লাইট দেখা দিয়েছে। সদরের বক্তারপুর, কীর্তিপুর ও তিলকপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেতের গাছের পাতা ঝলসে গেছে। কিছু ক্ষেতের গাছ মরে গেছে। কৃষকরা ছত্রাকনাশক ছিটাচ্ছেন। তবু কাজ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা। বক্তারপুর ইউনিয়নের কৃষক আকবর হোসেন এবার তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ সদরের চাকলা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘২০-২২ দিন পরই আলু তোলার জন্য পরিপক্ব হয়ে যেতো। কিন্তু হঠাৎ করে মড়ক দেখা দিয়েছে। দুই-একটা করে গাছ উপড়ে দেখছি, আলু পচে গেছে।’ জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর নওগাঁয় ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চার লাখ ২৪ হাজার ৭১৫ মেট্রিক টন। কিন্তু শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে আলুক্ষেতে লেটব্লাইট দেখা দিয়েছে। এই রোগে প্রথমে আলু গাছের পাতা ঝলসে যায়, পরে মরে যায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঘন কুয়াশার কারণে আলুক্ষেতে লেটব্লাইট রোগ দেখা দিয়েছে। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার সময় কৃষকদের ক্ষেতে নির্দিষ্ট মাত্রায় ছত্রাকনাশক ছিটানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বোরো বীজতলা রক্ষার জন্য পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা ও নিয়মিত সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের।’ *বগুড়া* বগুড়ার বিভিন্ন আলুক্ষেতে ছত্রাকজনিত লেটব্লাইট দেখা দিয়েছে। আলু বাঁচাতে কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ছিটাচ্ছেন। শেষ সময়ে রোগ দেখা দেওয়ায় ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, এবার জেলায় ৫৫ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে ১৩ লাখ ২০ হাজার ৪৭৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত মৌসুমে ৫৩ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে ১২ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছিল। এরই মধ্যে শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে লেটব্লাইট রোগ দেখা দিয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় কোনও প্রভাব পড়বে না। শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার, ধামাহার, গুজিয়া, মোকামতলা, বুড়িগঞ্জ, আটমুল, পৌর এলাকার সুলতানপুর নয়াপাড়া গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ আলুর ক্ষেতের গাছ মরে যাচ্ছে। সুলতানপুর নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক আবদুল মজিদ বলেন, ‘ছত্রাকনাশক স্প্রে করায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তবে স্প্রে করে তেমন কোনও কাজ হচ্ছে না। গাছ মরে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছি আমি।’ একই এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগে জমি থেকে আলু তোলা পর্যন্ত সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা ব্যয় হতো। এবার পাঁচবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়েছে। এতে ১০ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে।’ লেটব্লাইট ছত্রাকজনিত সংক্রমণ উল্লেখ করে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মুজাহিদ সরকার বলেন, ‘নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করায় এই রোগ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের ছত্রাকনাশক ম্যানকোজেন জাতীয় ওষুধ ছিটানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সঠিক সময়ে ওষুধ ছিটালে কাজ হবে। এবার শীতের তীব্রতা বেশি। তাই যেসব জমিতে লেটব্লাইট দেখা দিয়েছে সেগুলোতে পাঁচ-ছয়বার স্প্রে করতে হবে। কাজ না হলে ১০ বার পর্যন্ত স্প্রে করতে হবে। তবে কিছু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় প্রভাব পড়বে না।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক নাজমুল হক বলেন, ‘শীতের কারণে এই রোগ দেখা দিয়েছে। শীত কমলেই প্রকোপ কমে যাবে। জেলার সর্বোচ্চ ৫০০ হেক্টর জমির আলু গাছ আক্রান্ত হয়েছ। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। এতে কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’ *হিলি* দিনাজপুরের হিলিতে আলু ক্ষেতে দেখা দিয়েছে পচন রোগ। ওষুধ প্রয়োগেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহতের পাশাপাশি ও খরচ তোলা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, চলতি বছর উপজেলার এক হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এক হাজার ১৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। ১০ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন হিলির চন্ডিপুর গ্রামের কৃষক পলাশ বসাক। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকে আবহাওয়া ভালো থাকায় গাছগুলো সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আলু তোলা যেতো। কিন্তু শেষ সময়ে এসে শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে ক্ষেতে পচন রোগ দেখা দিয়েছে। এতে গাছ মরে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছি। উৎপাদন খরচ উঠানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ হিলির ইসমাইলপুর গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আলু গাছের পাতা কালো হয়ে মরে যাচ্ছে। অধিকাংশ জমিতে একই রোগ দেখা দিয়েছে। কৃষি অফিসের পরামর্শে ওষুধ দিচ্ছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।’ হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, তীব্র কুয়াশার কারণে আলুর ক্ষেতে লেটব্লাইট রোগ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের জমিতে নিয়মমাফিক স্প্রে করতে বলেছি আমরা। এক্ষেত্রে কৃষকরা ম্যানকোজেভ, সিকিউর ও মেলোডিডিউর ওষুধ জমিতে স্প্রে করলে প্রতিকার পাওয়া যাবে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে তাপমাত্রা বাড়লে এই অবস্থা কেটে যাবে। এতে শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই কৃষকদের।’
Published on: 2024-01-18 03:09:56.977986 +0100 CET

------------ Previous News ------------