বাংলা ট্রিবিউন
কুয়াশায় ঝরছে ফুল, ভাঙছে স্বপ্ন

কুয়াশায় ঝরছে ফুল, ভাঙছে স্বপ্ন

তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীর বিভিন্ন বাগানের ফুল ঝরে যাচ্ছে। অনেক ফুলগাছ মরে গেছে। এতে ভাঙছে চাষিদের স্বপ্ন। এভাবে ফুল ঝরায় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা। এ নিয়ে ফুল চাষি রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। চার দিন আগে বৃষ্টি, লাগাতার ঘন কুয়াশা আর প্রচণ্ড ঠান্ডায় তার বাগানের গোলাপ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘বাগানের সবগুলো গাছের কচি পাতা নষ্ট হয়ে ঝরে পড়ছে, গোলাপের কুঁড়িতে কালো দাগ, পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে। আগে এক বিঘা জমি থেকে প্রতিদিন এক হাজারের মতো গোলাপ তুলেছি, এখন একশ’র মতো পাচ্ছি। শুধু গোলাপ নয়, পাতা ঝলসে যাচ্ছে গ্লাডিওলাসের। ঠিকমতো ফুটছে না রজনীগন্ধা। বাজারে গোলাপসহ বিভিন্ন ফুলের আমদানি খুবই কম। তাই দাম বেশি। কিন্তু বেশিরভাগ বাগানের ফুল ঝরে যাচ্ছে। এতে লোকসানে পড়তে হবে।’ গদখালীর ফুল বাজারে আসা চাষিরা বলেছেন, এবার গোলাপ ফুলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রধান তিন উৎসব ঘিরে বাগানের পরিচর্যা করেছেন তারা। এরপরও ফুল ঝরে পড়ছে প্রতিদিন। ঝরে পড়ার কারণে চলতি মৌসুমে পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়বেন চাষিরা। সোমবার (২২ জানুয়ারি) গদখালী বাজারে গিয়ে গেছে, গোলাপের সংখ্যা কম। কমবেশি সব চাষির মুখে ফুল ঝরে পড়ার কথা। এ নিয়ে কোনও প্রতিকার আছে কিনা, একে-অপরের কাছে জানতে চাচ্ছেন। এদিন গোলাপ ৯-১২ টাকা, গ্লাডিওলাস ৫-১২ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা (হলুদ) দুই-আড়াই, চন্দ্রমল্লিকা (সাদা) দেড়-দুই, রজনীগন্ধা ছয়-আট, জারবেরা ১০-১২ টাকা পিস এবং গাঁদা প্রতি হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। পাটুয়াপাড়ার চাষি সোহেল রানা শাওন বাজারে এনেছেন ৫০০ পিস গোলাপ। ফুলের পাপড়িতে কালো দাগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তিন বিঘা জমি থেকে ৫০০ গোলাপ তুলেছি। বিক্রি করছি ১১ টাকা দরে। দাম বেশি পেলেও জমি হিসেবে সংখ্যা অনেক কম। গত বছর একই বাগান থেকে পাঁচ লাখ টাকার গোলাপ বিক্রি করেছিলাম। এবার অর্ধেক বিক্রি হয়নি। শীত আর ঘন কুয়াশায় বাগানের ৭০ শতাংশ ফুল ঝরে গেছে। কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারির তিন উৎসবে লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবো কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’ কুয়াশার কারণে পাতা ঝরে যাচ্ছে, গাছ মরে যাচ্ছে উল্লেখ করে এই চাষি আরও বলেন, ‘ওষুধের দোকানি আর কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে রোভরাল নামে একটি ওষুধ ব্যবহার করেও কোনও সুফল পাচ্ছি না। গোলাপের সঙ্গে গ্লাডিওলাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’ লোকসানের মুখে পড়ার কথা জানিয়ে আরেক চাষি মফিজুর রহমান বলেন, ‘সোমবার গোলাপের পিস ১০-১১ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গত ডিসেম্বরে পাঁচ টাকায় পিস বিক্রি করেছি। এক বিঘা জমিতে গোলাপ, ১০ কাঠায় গ্লাডিওলাস এবং এক বিঘায় গাঁদা ফুল চাষ করেছি। আবহাওয়ার কারণে গোলাপের উৎপাদন একেবারে কমে গেছে। গাছে পাতা নেই, পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে। গত বছর দুই লাখ টাকার গোলাপ বিক্রি করেছিলাম। এবার ৫০ হাজার টাকারও বিক্রি হবে না। এতে লোকসান গুনতে হবে।’ গদখালীর হাড়িয়া এলাকায় এক বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন রহমত আলী। তার বাগানের অধিকাংশ ফুল ঝরে গেছে। তিনি বলেন, ‘পাতা শুকিয়ে পড়ে যাচ্ছে, পচন লেগেছে পাপড়িতে। যেখানে হাজার পিস গোলাপ পাওয়ার কথা, সেখানে তিনশ’র বেশি তুলতে পারছি না। ওষুধের দোকানির কাছ থেকে শুনে রেডিমিল নামে একটি ওষুধ দিয়েছিলাম, কোনও কাজ হয়নি। প্রতিদিন পাতা ঝরছে, ফুল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ ফুল ঝরে পড়া রোধে কৃষি কর্মকর্তারা কোনও পরামর্শ দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে রহমত আলী বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তারা মাঠেই তো যান না, কীভাবে পরামর্শ নেবো। আমার ক্ষেতের ৬০ শতাংশ গোলাপ নষ্ট হয়ে গেছে। অধিকাংশ বাগানের অবস্থা একই। এরপরও কোনও পরামর্শ দিতে আসেননি কৃষি কর্মকর্তারা।’ একই কথা জানালেন পাটুয়াপাড়ার কৃষক শওকত আলী। তিনি বলেন, ‘গোলাপের পচন ও ঝরে পড়া রোধে রিভার্স নামের একটা ওষুধ ব্যবহার করেছিলাম। কুয়াশার কারণে বাগানের ৬০ শতাংশ গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। দেড় বিঘা জমি থেকে চারশ’ গোলাপ বাজারে এনেছি। সাড়ে ৯ টাকা দরে বিক্রি করেছি।’ একই গ্রামের শাহিন আলম নামের আরেক চাষি বলেন, ‘গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পাতা কালো বর্ণ ধারণ করে শুকিয়ে যাচ্ছে, পাপড়ি কালো হয়ে ঝরে গেছে। কোনও গোলাপই বিক্রির উপযোগী থাকছে না। ফুলের রাজ্য গদখালীর সব বাগানের একই অবস্থা। সব চাষিকে এবার লোকসান গুনতে হবে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোরের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে প্রায় ছয় হাজার কৃষক ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট ফুলের চাহিদার ৭৪ শতাংশ এই জেলা থেকে সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস থেকে গদখালীর ফুলের চাহিদা ও বিক্রি বাড়তে থাকে। সেইসঙ্গে বাড়ে দামও। মৌসুমের শুরুতে গদখালীর ফুলের বাজার বেশ ভালো, দামও আশানুরূপ ছিল বলে জানিয়েছেন যশোর ফুল উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, ‘এবার ফুলের বাজার থেকে ১০০ কোটি টাকার ওপরে ফুল বিক্রির আশা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া বিশেষ করে বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা আর অতিরিক্ত ঠান্ডায় গোলাপ, গ্লাডিওলাস ও গাঁদা ফুল নষ্ট হয়ে গেছে। এতে চাষিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফেব্রুয়ারি মাসের উৎসব সামনে রেখে মূলত চাষিরা বাগান পরিচর্যা করে থাকেন। কিন্তু গোলাপের কুঁড়ি নষ্ট হলে আগামীর পূর্ণাঙ্গ ফুলও নষ্ট হয়ে যায়। পাতা ঝরে পড়ে যাওয়ায় গাছের খাদ্য তৈরিও বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারণে গোলাপের বাজার থেকে পাঁচ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছি আমরা।’ ফুল ঝরে পড়া রোধে চাষিদের কোনও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হাসান পলাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাগান পরিদর্শন করে জানতে পেরেছি, চায়না গোলাপ বিশেষ করে যেসব গাছের বয়স এক বছরের কম, সেগুলোতে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। মূলত বেশি সার প্রয়োগ, পাঁচবারের বেশি সেচ দেওয়া, বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার কারণে পাতা স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। গাছের গোড়ায় ফাঙ্গাস দেখেছি। মঙ্গলবার বিকালে ফুল চাষি ইসমাইলের শেডে সব গোলাপ চাষিকে আসতে বলেছি। পাশাপাশি কীট ও ছত্রাকনাশক বিক্রেতাদের ডেকেছি। সবাইকে নিয়ে বসে চাষিদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আপাতত গোলাপ গাছের গোড়া শুকনো ও ছত্রাকমুক্ত করতে চাষিদের ডলোমাইট ও জিপসাম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি আমরা।’ প্রসঙ্গত, যশোরে গত ১৮ জানুয়ারি ভোর থেকে দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছিল। ওই দিন জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল ২২ মিলিমিটার। সেদিন তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি। সোমবার (২২ জানুয়ারি) ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
Published on: 2024-01-23 03:11:23.67625 +0100 CET

------------ Previous News ------------