বাংলা ট্রিবিউন
ঘন কুয়াশায় বীজতলা নিয়ে বিপাকে কৃষকরা

ঘন কুয়াশায় বীজতলা নিয়ে বিপাকে কৃষকরা

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ঠান্ডা হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত নীলফামারীর জনজীবন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় আলু, ভুট্টা, সরিষা ও বোরো ধানের বীজতলাসহ বিভিন্ন সবজি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন জেলার কৃষকরা। বীজতলা ঝলসে যাচ্ছে। কীটনাশক ছিটিয়েও কোনও প্রতিকার পাচ্ছেন না তারা। এতে সময়মতো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, জেলায় এ বছর আলু ২১ হাজার ৭১২ হেক্টর, বোরো বীজতলা ৪ হাজার ৩৯৮ হেক্টর, ভুট্টা ২৭ হাজার ৯৭৩ হেক্টর ও সরিষা ৬ হাজার ৭৭৭ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার ছয় উপজেলায় ফসলের মাঠজুড়ে আলু, ভুট্টা, সরিষা ও বোরো ধানের বীজতলাসহ সবজি রক্ষার কাজে ব্যস্ত কৃষক। অধিকাংশ বীজতলা ঠান্ডাজনিত রোগে ঝলসে গেছে। হলুদ ও ঝলসানো রোগ থেকে বাঁচাতে বীজতলায় পলিথিন ব্যবহার করেও লাভ হচ্ছে না। কিন্তু যেভাবে আলুর জমিতে লেইটব্লাইট (নাবিধসা) রোগের শঙ্কায় রয়েছেন কৃষক। এ কারণে আলু, ভুট্টা, সরিষা ও বোরো ধানের বীজ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ছত্রাকনাশক প্যাকেটের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় চাষিরা। সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাহালীপাড়া গ্রামের কৃষক সাহাবুল ইসলাম বলেন, দুই ভাই একত্রে ১ শতাংশ জমির ওপর স্যালো মেশিনের পানি দিয়ে বীজতলা করেছি। সুন্দর বীজও (৪ থেকে ৫ ইঞ্চি) হয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে ঘন কুয়াশা পড়ে সিংহভাগ বীজতলা ঝলসে গেছে। এবার চড়া দামে চারা কিনে ধানের আবাদ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। একই ইউনিয়নের বিশমুড়ি গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, এবার দেড় বিঘা জমিতে বোরো আবাদের জন্য বীজতলা তৈরি করেছিলাম। আশা ছিল লাভের জন্য কিছু বিক্রি করবো। কিন্তু ২১ দিন ধরে কুয়াশা আর শীতের তীব্রতায় বীজতলা হলুদ হয়ে গেছে। কীটনাশক ও পলিথিন দিয়ে কিছুটা রক্ষা করেছি। একই উপজেলার ইটাখোলা ইউনিয়নের ইটাখোলা গ্রামের সবজিচাষি আনোয়ার, বীজতলার মালিক জাহানুর ও আলুচাষি রশিদুল ইসলাম বলেন, অর্ধেক জমির আলুগাছ পচন রোগে মরে গেছে। প্রতি বিঘা জমিতে যে পরিমাণ সার ও বীজ খরচ হয়েছে, সেই পরিমাণ আলু ঘরে তোলা যাবে না। গাছ শুকিয়ে মরে গেছে। এবার কুয়াশা ও শীতের কারণে সবজি ও বীজতলায় কীটনাশক ছিটাতে অনেক খরচ হয়েছে। এ অবস্থায় লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে বলে জানান তারা। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লোকমান হাকিম জানান, গত ২২ জানুয়ারি জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ ও গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৫-৬ কিলোমিটার। ২৩ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ। আলু, বোরোর বীজতলা, ভুট্টা ও সরিষাক্ষেতের জন্য এ ধরনের তাপমাত্রা সহনশীল নয়। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক আহমেদ বলেন, চলতি মৌসুমে সদরে ১ হাজার ২৭৪ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। ঘন কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডায় কৃষকদের বোরো আবাদে বিলম্ব হচ্ছে। বীজতলা এখনও নষ্ট হয়নি। তবে তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলে চারা খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে পাতা হলুদ হয়ে যায়। বীজতলা নষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে কৃষকদের বাড়তি যত্ন ও ব্যবস্থা নেওয়াসহ মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। আশা করি আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে এ সমস্যা কেটে যাবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. এস এম আবু বক্কর সাইফুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় আলুক্ষেতে লেইটব্লাইট (নাবিধসা) রোগ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে যেসব বীজতলা কুয়াশায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, সেগুলো জমিতে সেচ দিয়ে সারা দিন ভিজিয়ে রেখে সকালে পানি বের করে দিতে হবে। পলিথিনের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে জমা শিশির ঝরিয়ে দিতে হবে। বীজতলার চারা হলুদ হয়ে গেলে প্রতি শতক জমিতে ২৮০ গ্রাম ইউরিয়া সার দিতে হবে। এরপরও চারা সবুজ না হলে একই নিয়মে ৪০০ গ্রাম জিপসাম সার দিতে হবে। এতে চারার ক্ষতির আশঙ্কা কেটে যাবে। আমরা সব সময় রোগ দমনে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
Published on: 2024-01-27 05:12:39.21734 +0100 CET

------------ Previous News ------------