বাংলা ট্রিবিউন
যশোরের মাটিতে প্রথম চাষ হলো আমেরিকান-মেক্সিকান খাদ্যশস্য

যশোরের মাটিতে প্রথম চাষ হলো আমেরিকান-মেক্সিকান খাদ্যশস্য

যশোরের মাটিতে প্রথমবার পুষ্টি, ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ বিদেশি খাদ্যশস্য চিয়া সিড এবং কিনোয়া চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জুলফিকার সিদ্দিক। কিছুদিন পরই তার জমিতে চাষ করা এই পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল উঠবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খরচ বাদে লক্ষাধিক টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন এই কৃষক। সরেজমিনে দেখা গেছে, চৌগাছা উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের হিজলী গ্রামের বাজারের পাশে কৃষি নার্সারি করেছেন জুলফিকার সিদ্দিক (৫৩)। বিদেশি ও নিত্যনতুন ফসল নিয়ে চাষাবাদ। এবার চাষ করেছেন মেক্সিকান চিয়া সিড ও আমেরিকার কিনোয়া নামের দুটি ফসল। ৩০ শতাংশ জমিতে দুটি ফসলের চাষ করেছেন। দুটি ফসল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। *চাষাবাদ শুরুর কথা* জুলফিকার সিদ্দিক ১৯৯৫ সালে নার্সারি ব্যবসায় আসেন। হিজলী বাজারের পাশঘেঁষে এক একর জমি রয়েছে তার। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ নিজের, বাকি লিজ নেওয়া। চারদিক ঘেরা জমিটিতে নতুন নতুন ফসল আবাদ করে থাকেন। প্রথমে মেহগনির চারা দিয়ে নার্সারি শুরু করেছিলেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে কাজী পেয়ারার চারা তৈরি করেন। সেই পেয়ারা এখনও চৌগাছার বিভিন্ন মাঠে চাষ হচ্ছে। এতে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ২০০৮ সালে নার্সারিতে প্রথমবার স্ট্রবেরি চাষ করেছি জানিয়ে জুলফিকার সিদ্দিক বলেন, ‘পরের বছর ড্রাগন চাষ করি। বিদেশি ফল-ফসল নিয়েই মূলত আমার চাষাবাদ। ড্রাগন চাষ শুরুর পর এখন মাঠে-ঘাটে সেটি দেখতে পাচ্ছেন। দেশি-বিদেশি ফল-ফসল নিয়ে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। সাত বছর আগে লাগানো ৩০টি জাপানি পার্সিমন ফল গাছে ফলন এসেছিল। পরেরবার প্রচুর ফল ধরেছিল। তবে ফল বিক্রি করিনি। এলাকার লোকজনকে খাইয়েছি। নাটোরের হর্টিকালচার সেন্টার থেকে এই ফলের বীজ এনেছিলাম। *জুলফিকার সিদ্দিক* কর্মজীবন শুরু হয় নার্সারি ব্যবসার মাধ্যমে। ২০০১ সালে নার্সারির পাশাপাশি স্ক্রিন প্রিন্টের কাজ শুরু করেন। কিন্তু স্ক্রিন প্রিন্টে ব্যবহৃত রাসায়নিক বেনজিনের কারণে তার শরীর খারাপ হতে থাকে। এরপর তা বাদ দেন। পরে বাবার কথা অনুযায়ী নার্সারি ব্যবসায় পুরোপুরি মনোযোগ দেন। পড়াশোনা করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জনক। আগামীতে সৌদি আরবের ফল বারসুম নিয়ে কাজ করতে চান। ফণিমনসা প্রজাতির এই বারসুম দেখতে ড্রাগন ফলের মতো। *চিয়া সিড ও কিনোয়ার চাষ* এবার ২০ শতক জমিতে চিয়া সিড চাষ করেছেন এই কৃষক। দুই ভাগে চিয়া সিডের ক্ষেত। একটি অংশে আগাম চিয়া, পরের অংশে লাবি। আরও ১০ শতক জমিতে কিনোয়া চাষ করেছেন। *চিয়া ও কিনোয়ার দাম কেমন?* চিয়া ও কিনোয়ার দাম বেশ ভালো। এই কৃষকের এক একর জমিতে রয়েছে চিয়া সিড, কিনোয়া, জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন, ক্যাপসিকাম, ড্রাগন, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও চুইঝাল ইত্যাদি। এখানে উৎপাদিত ফল-ফসল বিক্রি করে বেশ ভালো আছি জানিয়ে জুলফিকার বলেন, ‘চিয়া সিড ও কিনোয়া বিক্রি করে খরচ বাদে লাখ টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করছি। যদিও আগাম চিয়া বর্ষায় একটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতি কেজি চিয়া সিডের দাম এক হাজারের মতো। তবে কিনোয়ার কেজি এক থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হবে। ১০ শতক জমিতে ৩০ কেজির মতো কিনোয়া পাবো। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ফলন তোলা যাবে। প্রতি ১০ শতকে ১০ কেজির বেশি চিয়া পাবো। মার্চ মাসে ফলন তোলা যাবে।’ *ক্রেতা কারা?* এ বিষয়ে জুলফিকার সিদ্দিক বলেন, ‘চিয়া সিড ও কিনোয়ার ক্রেতা আসলে ছিল না। ইদানিং মোবাইলে অনেক ক্রেতার সন্ধান মিলেছে। যে হারে মোবাইলে চাহিদার কথা শুনছি, তাতে ফলন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারবো না। অনেকে দেখতে চেয়েছেন, আমি তাদের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে আসতে বলেছি।’ *চিয়া সিডের পুষ্টিগুণ* বর্তমান সময়ে অনেকে স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ সচেতন। বিশেষ করে করোনাকালীন জটিলতার পর সেই সতেচনতা বেড়ে গিয়েছে আরও কয়েক গুণ। প্রতিদিনের খাবার ও খাবারের পুষ্টিগুণ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের খাবারের তালিকায় এখন বেশ জনপ্রিয় চিয়া সিড। চিয়া হচ্ছে সালভিয়া হিসপানিকা নামক মিন্ট প্রজাতির উদ্ভিদের বীজ। এটি মূলত মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকোর মরুভূমি অঞ্চলে বেশি জন্মায়। প্রাচীন অ্যাজটেক জাতির খাদ্য তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করে থাকেন। এগুলো দেখতে অনেকটা তোকমা দানার মতো। চিয়া বীজ সাদা ও কালো রঙের এবং তিলের মতো ছোট আকারের। বীজ জাতীয় যেকোনো খাবারই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। চিয়া সিডকে বলা হয় সুপারফুড। এতে আছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, কোয়েরসেটিন, কেম্পফেরল, ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ও ক্যাফিক এসিড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় খাদ্য আঁশ। পুষ্টিবিদরা বলছেন, চিয়া সিড অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। এতে আছে দুধের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি, পালং শাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশি আয়রন, কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম, মুরগির ডিম থেকে ৩ গুণ বেশি প্রোটিন, এতে আছে স্যামন মাছের চেয়ে ৮ গুণ বেশি ওমেগা-৩। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে বা যারা ব্যায়াম করেন, তারা ব্যায়ামের এক ঘণ্টা পর চিয়া সিড খেতে পারেন। *কিনোয়ার পুষ্টিগুণ* এটি চাষ করা যেমন সহজ, রান্না করাও সহজ। চাল বা গমের মতো করে কিনোয়া দিয়ে বিভিন্ন রকম সুস্বাদু খাদ্য প্রস্তুত করা যায়। শরীরের জন্য বেশ উপকারী। মাইগ্রেনের ব্যথা থেকে স্বস্তি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, রক্ত স্বল্পতা দূর, ত্বক ও চুলের সুস্থতা এবং বলিরেখা দূর করতে সহায়তা করেন। বিশেষ করে কিনোয়াতে থাকা ভিটামিন বি ত্বকে বলিরেখা পড়তে দেয় না। জুলফিকার সিদ্দিক বলেন, ‘চিয়া সিড খুবই পুষ্টিকর, মানবদেহের জন্য খুব উপকারী। পুষ্টির পাশাপাশি এটি দেহের ওজন কমাতে সাহায্য করে। অনেকটা তিলের মতো দেখতে। পানিতে ভেজালে চিয়া ফুলে ওঠে বহু গুণ। কিনোয়া হচ্ছে আমেরিকান নভোচারীদের পছন্দের খাবার। এটিও বেশ পুষ্টিকর। উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় ফসল কিনোয়াকে নিয়ে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গবেষণা করা হয়েছে। দীর্ঘ গবেষণার পর মাঠপর্যায়ে পাঁচটি প্লটে নতুন করে চাষাবাদ করা হয়েছে।’ কৃষি বিজ্ঞানীরা জানান, বাংলাদেশে কিনোয়ার চাষের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিনোয়ার ব্যাপক চাহিদা আছে। কিনোয়া হলো হাই প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার। এতে অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে এবং লাইসিনসমৃদ্ধ; যা সারা শরীরজুড়ে স্বাস্থ্যকর টিস্যু বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কিনোয়ায় আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-ই, পটাসিয়াম এবং ফাইবারের অন্যতম উৎস। কিনোয়া রান্না করা হলে এর দানাগুলো আকারে চার গুণ বড় হয়ে যায় এবং দেখতে প্রায় স্বচ্ছ হয়। *যা জানালেন কৃষি কর্মকর্তা* এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, ‘চিয়া সিড ও কিনোয়া মূলত রবি ফসল। এটি অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে চাষ হয়, ফলন তোলা যায় মার্চ মাসে। কিনোয়াতে প্রচুর পরিমাণ মিনারেল, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। এটির শাক (স্থানীয়ভাবে বলে বতুয়া শাক) খাওয়া যায়। আবার ফলও রান্না করে খাওয়া যায়। সাধারণত পায়েস বা জাউ হিসেবে খেতে পারি আমরা।’ চিয়া সিডে অনেক পুষ্টি রয়েছে উল্লেখ করে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমিষ জাতীয় খাবার বিশেষ করে দুধ, ডিম বা মাংসের চেয়ে বেশি প্রোটিন চিয়া সিডে আছে। এছাড়া ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের খনিজ উপাদান রয়েছেন। যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।’ *কিনোয়া নিয়ে গবেষণা শুরু হয়নি* চিয়া সিড ও কিনোয়ার চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে চাইলে যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাওছার উদ্দীন আহম্মদ বলেন, ‘চিয়া সিডের প্রদর্শনী ক্ষেতে আমাদের গবেষণা কেন্দ্রে রয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এই ফসল নিয়ে গবেষণা করছি আমরা। এটি যে সুপারফুড তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদানই রয়েছে। এর দামও বেশি। তবে কিনোয়ার বিষয়ে আমরা এখনও গবেষণায় যাইনি। এটি আমাদের খুলনা অফিসের তত্ত্বাবধানে আছে।’
Published on: 2024-01-30 03:05:00.58678 +0100 CET

------------ Previous News ------------