বাংলা ট্রিবিউন
সংরক্ষিত মহিলা আসনে যেসব বিবেচনায় মিলবে আ.লীগের মনোনয়ন

সংরক্ষিত মহিলা আসনে যেসব বিবেচনায় মিলবে আ.লীগের মনোনয়ন

নতুনদের সুযোগ করে দেওয়ার নীতিতে গত জাতীয় সংসদের প্রতিটিতেই আওয়ামী লীগের পাওয়া ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনগুলোতে’ বেশিরভাগই নতুন মুখ দেখা গেছে। এবারও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। নবম, দশম ও একাদশের ধারাবাহিকতায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও সরকার দলের পাওয়া সংরক্ষিত আসনে বেশিরভাগ নতুন মুখ আসছে। এক্ষেত্রে সংগঠনের ত্যাগী, বঞ্চিত, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী নারী নেত্রীদের প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। এছাড়া বিগত সময়ে যেসব জেলা বঞ্চিত হয়েছে সেসব জেলাকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বশীল নেত্রীদের কয়েকজন সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। মনোনয়ন পেতে পারেন শরিক দলের দুয়েকজনও। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ও গণভবন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের (একটি স্থগিত রয়েছে) মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২৩টি, জাতীয় পার্টি ১১টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও কল্যাণ পার্টি একটি করে আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া স্বতন্ত্ররা জয়ী হয়েছেন ৬২টি আসনে। আসনের সংখ্যানুপাতে এককভাবে আওয়ামী লীগের ৩৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসন পাওয়ার কথা। এছাড়া জাতীয় পার্টি দুটি ও স্বতন্ত্ররা ১০টি আসন এবং বাকি তিনটি দল একত্রে এলে একটি আসন পাওয়ার কথা। তবে ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের অংশের সংরক্ষিত আসনগুলো আওয়ামী লীগকে ছেড়ে দিয়েছে। স্বতন্ত্র ইস্যুতে ১৪ দলের শরিক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ এখন ৫০টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ৪৮টি পাচ্ছে। বুধবার (৩১ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনে দলটির প্রতিনিধিরা ৪৮টি আসন প্রাপ্তির বিষয়ে তাদের দল ও জোটগত তথ্য জমা দিয়েছে। বাকি দুটি আসন পাচ্ছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। আজ ছিল নির্বাচন কমিশনের কাছে সংরক্ষিত আসন ইস্যুতে দল ও জোটগত অবস্থান জানানোর শেষ দিন। কমিশন এখন এই অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করে সংরক্ষিত মহিলা আসনের তফসিল ঘোষণা করবে। সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনের আইন অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ কার্যদিবসের পর দিন সংসদ সদস্যদের (ভোটার তালিকা) তালিকা প্রকাশ করবে ইসি। এ হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি তাদের তালিকা প্রকাশ করে তারপর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা। জানা গেছে, আইন পর্যালোচনার জন্য কমিশনার রাশেদা সুলতানাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনি সুযোগ থাকলে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমদিকে তফসিল হতে পারে। আর তা না হলে ২১ ফেব্রুয়ারির পরেই হবে সংরক্ষিত মহিলা আসনের তফসিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার গঠনের পরপরই সংরক্ষিত আসনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা (আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদধারী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা) দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের কাছে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নানা ত্যাগ ও অর্জনের কথা তুলে ধরে বায়োডাটা জমা দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণে কেউ কেউ বায়োডাটা গণভবনেও জমা দিচ্ছেন। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েও আবেদন করেছেন। গত ২৫ জানুয়ারি গণভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এসময় কারও কারও খোঁজ-খবর নেন। দলের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে কাদের আনা যায়, সেটা পর্যালোচনা করছেন। সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় আরও কিছু নতুন নামও যুক্ত করা হতে পারে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা বেশি থাকছে। মনোনয়ন পেয়েও জোট বা শরিকদের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া এবং যোগ্যতায় এগিয়ে থাকার পরও যাদের নানা কারণে দলের মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয়নি, এমন নারী নেত্রীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বরাবরই নতুন ও বঞ্চিতদের মূল্যায়ন করছেন। এবারও সংরক্ষিত আসনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে। বুধবার নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগের জোটগত অবস্থান জানানোর পর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী পরিবারের সন্তানদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া মহিলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নারী নেত্রী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আওয়ামী নেত্রীরা গুরুত্ব পাবেন। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগীদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য মনোনয়ন নেওয়ার বা চাওয়ার যে হিড়িক, সেই তুলনায় আমাদের দেওয়ার সুযোগ খুব কম। আমরা আমাদের পরীক্ষিত, ত্যাগীদের গুরুত্ব দেবো। যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যারা আমাদের দুঃসময়ের পরীক্ষিত কর্মী, তাদের ব্যাপারটা আমরা অগ্রাধিকার দেবো।’ বিদায়ী একাদশ সংসদে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত মহিলা এমপি ছিল ৪৩ জন। এর মধ্যে খাদিজাতুল আনোয়ার, রুমানা আলী ও সুলতানা নাদিরা দলের মনোনয়নে এবং তাহমিনা বেগম স্বতন্ত্র ভোট করে এবার সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি যে ৩৯ জনের মধ্যে হাতে গোনা দুই-একজন ছাড়া বেশিরভাগই এবার বাদ পড়বেন বলে জানা গেছে। একাদশের সংরক্ষিত আসনের এমপিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান এবারও মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এর বাইরে অ্যারোমা দত্ত ও নাহিদ ইজহার খানসহ দু-একজনের নাম আলোচনায় আছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েও ১৪ দলীয় জোটকে ছেড়ে দেওয়ার কারণে প্রত্যাহার করে নেওয়া দলের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী সংরক্ষিত আসনের এমপি হতে পারেন। তিনি নবম সংসদেও সংরক্ষিত আসনের এমপি হয়েছিলেন। এছাড়া মনোনয়ন বঞ্চিত তিনবারের নির্বাচিত এমপি সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানও রয়েছেন বিবেচনায়। জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ায় প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়া মাহাবুব আরা গিনিও সংরক্ষিত আসনের এমপি হতে পারেন। দ্বৈত নাগরিকত্বের জেরে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে, তার দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাপা, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, মারুফা আক্তার পপি ও পারভীন জামান কল্পনা সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। এছাড়া আলোচনায় আছেন দশম সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি তারানা হালিম। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দু-একজনের স্ত্রীও হতে পারেন সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি। এদিকে মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও মহিলা শ্রমিক লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকরা সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। এদের মধ্যে মহিলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদিকা কাজী রহিমা আক্তার সাথী মনোনয়ন পেতে পারেন বলে জানা গেছে। বিনোদন জগৎ, লেখক ও শিল্পীদের মধ্যে থেকে অন্তত দুজনকে স্থান দেওয়া হতে পারে সংরক্ষিত আসনে। এ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও লাকী ইনামের নাম আলোচনায় আছে। সংরক্ষিত আসনের এমপি করে বন্যাকে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী কন্যা শমী কায়সার ও শাওন মাহমুদ আলোচনায় রয়েছেন। অতীতের মনোনয়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনে একটা বড় সংখ্যায় মনোনয়ন পান পরিবারের অবদানের কারণে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের জন্য দাদা, নানা, পিতা, স্বামী বা ভাইয়ের ত্যাগকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে দ্বাদশ সংসদেও এমন পরিবারের নারী সদস্যদের কেউ কেউ জায়গা পাবেন। সংসদ নির্বাচনের আসন বণ্টনে একেবারে সীমিত আসন পাওয়া ১৪ দলীয় জোটের শরিকদেরও এক বা দুটি সংরক্ষিত আসনে এমপি করা হতে পারে। এক্ষেত্রে একাদশ সংসদে বছর খানেক সময় সংরক্ষিত আসনের এমপি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক ও জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের নাম আলোচনায় আছে।. অন্যান্য সংসদের মতো এবারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা থেকেও দু-তিনজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য করা হতে পারে। এর বাইরে গত সংসদে যেসব জেলা থেকে সংরক্ষিত সংসদ সদস্য করা হয়নি, সেসব জেলা এবার অগ্রাধিকার পাবে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন।
Published on: 2024-01-31 17:07:44.132311 +0100 CET

------------ Previous News ------------