বাংলা ট্রিবিউন
টাঙ্গাইলের ছয় আসনে চাপে আছেন নৌকার প্রার্থীরা, দুটিতে নির্ভার

টাঙ্গাইলের ছয় আসনে চাপে আছেন নৌকার প্রার্থীরা, দুটিতে নির্ভার

টাঙ্গাইলে ১২টি উপজেলা নিয়ে আটটি সংসদীয় আসন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আট আসনে সরকারদলীয় ছাড়াও বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫৫ জন। এর মধ্যে ছয়টিতে চাপে রয়েছেন আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীরা। বাকি দুইটিতে নৌকার প্রার্থীরা নির্ভার রয়েছেন। এবার ছয়টি আসনে জয় পেতে নৌকার প্রার্থীদের হিমশিম খেতে হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মামুন-অর-রশিদ মামুন (নৌকা), টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে বর্তমান এমপি তানভীর হাসান ছোটমনির (নৌকা), টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে ডা. কামরুল হাসান খান (নৌকা), টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু (নৌকা), টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে বর্তমান এমপি খান আহমেদ শুভ (নৌকা) ও টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনে সাবেক এমপি অনুপম শাহজাহান জয় (নৌকা) ভোটযুদ্ধে চাপের মুখে রয়েছেন। এসব আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) ও অন্য দলের প্রার্থীরা সমানতালে এগিয়ে রয়েছেন। এদিকে, প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সরকারদলীয়, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের প্রার্থী। রাত-দিন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। আটটি আসনের মধ্যে টাঙ্গাইল-৫ ও টাঙ্গাইল-২ আসনে প্রতিনিয়ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। তবে অন্যান্য আসনে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার-প্রচারণা চলছে। টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে চার জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক (নৌকা)। তার বিপক্ষে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি খন্দকার আনোয়ারুল হক (ট্রাক), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী ফারুক আহমেদ (গামছা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আলী (লাঙ্গল)। এই আসনে নির্ভার রয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। তার সঙ্গে অন্যদের ভোটের ব্যবধান হবে দ্বিগুণের বেশি এমনটাই প্রত্যাশা বলছেন মন্ত্রীর কর্মী-সমর্থকরা। টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে ছয় জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি তানভীর হাসান ছোটমনির (নৌকা)। তার বিপক্ষে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু (ঈগল)। ছোটমনির সঙ্গে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠান্ডুর পক্ষে গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা কাজ করছেন। এজন্য তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে বর্তমান এমপি ছোটমনির চেয়ার ধরে রাখতে চাইছেন। দুই প্রার্থীই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলছেন। মাঝেমধ্যেই অফিস ভাঙচুরসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। দুই প্রার্থী ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির হুমায়ূন কবির তালুকদার (লাঙ্গল), গণফ্রন্টের গোলাম সারোয়ার (মাছ), বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোহাম্মদ রেজাউল করিম (ডাব) ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সাইফুল ইসলাম (আম)। টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে ছয় জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. কামরুল হাসান খান (নৌকা)। তার সঙ্গে সাবেক দুবারের এমপি স্বতন্ত্র প্রার্থী আমানুর রহমান খান রানার (ঈগল) মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আমানুর রহমান খান রানা এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানের ছেলে। পুরো টাঙ্গাইলে খান পরিবারের আধিপত্য রয়েছে। আমানুর রহমান খান রানারও ঘাটাইল উপজেলায় জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর ডা. কামরুল হাসান খান এবার প্রথম নির্বাচনি মাঠে এসেছেন। তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করছেন। সব মিলিয়ে এখানে নৌকার প্রার্থী ডা. কামরুল হাসান চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। তারা ছাড়াও এখানে লড়ছেন জাতীয় পার্টির আব্দুল হালিম (লাঙ্গল), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. জাকির হোসেন (নোঙ্গর), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের সাখাওয়াত খান সৈকত (চাকা) ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির হাসান আল মামুন সোহাগ (আম)। টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে আট জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডুর (নৌকা) সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী এবং চারবারের এমপি আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর (ট্রাক) হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে নির্বাচনি মাঠে কাজ করছেন। এজন্য সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী। এই আসনে নতুন হিসেবে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক পাঁচবারের এমপি প্রয়াত শাজাহান সিরাজের মেয়ে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজও এগিয়ে আছেন। এই তিন জন ছাড়াও এখানে ভোটযুদ্ধে রয়েছেন জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী (লাঙ্গল), জাকের পার্টির মোন্তাজ আলী (গোলাপ ফুল), তৃণমূল বিএনপির শহীদুল ইসলাম (সোনালী আঁশ), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির শুকুর মামুদ (একতারা) ও জাতীয় পার্টির (জেপি) সাদেক সিদ্দিকী (বাইসাইকেল)। টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে নয় জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মামুন-অর-রশিদ মামুনের (নৌকা) সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান এমপি ছানোয়ার হোসেনের (ঈগল) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুরাদ সিদ্দিকীর (মাথাল) লড়াই হবে। ছানোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তার পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি অংশ কাজ করছেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী জামিলুর রহমান মিরন (ট্রাক) নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মামুন-অর-রশিদকে সমর্থন দিয়েছেন। ছানোয়ার হোসেন ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকীর ভোট ব্যাংক থাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মামুন-অর-রশিদ চাপে রয়েছেন। এজন্য ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নৌকার প্রার্থী মামুন-অর-রশিদ ও বর্তমান এমপি ছানোয়ার হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর ছাড়াও সম্প্রতি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। এই তিন জন প্রার্থী ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার আহসান হাবিব (কেটলি), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. তৌহিদুল রহমান চাকলাদার (নোঙ্গর), জাতীয় পার্টির মো. মোজাম্মেল হক (লাঙ্গল), তৃণমূল বিএনপির শরিফুজ্জামান খান (সোনালী আঁশ) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির হাসরত খান ভাসানী (একতারা)। টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে আট জন লড়ছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বর্তমান এমপি আহসানুল ইসলাম টিটুর (নৌকা) সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী তারেক শামস খান হিমু (ঈগল) ও জাতীয় পার্টির মো. আবুল কাশেমের (লাঙ্গল) মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন বর্তমান এমপি আহসানুল ইসলাম। তিন প্রার্থী ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম (ট্রাক), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের খন্দকার ওয়াহিদ মুরাদ (নোঙ্গর), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আব্দুল করিম (একতারা), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মো. আনোয়ার হোসেন (ফুলের মালা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মাহমুদুল ইলাহ (বাঁশি)। টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে আট জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বর্তমান এমপি খান আহমেদের (নৌকা) সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী আটবারের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর এনায়েত হোসেন মন্টুর (ট্রাক) ভোটযুদ্ধ হবে। বর্তমান এমপি খান আহমেদের পক্ষে কাজ না করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী মীর এনায়েত হোসেন মন্টুর পক্ষে কাজ করছেন। ক্লিন ইমেজের এই প্রবীণ নেতাকে টপকাতে চরম বেগ পেতে হবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে। ফলে চাপে রয়েছেন তিনি। এই দুই প্রার্থী ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের আরমান হোসেন তালুকদার (গামছা), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির গোলাম নওজব চৌধুরী (হাতুড়ি), জাতীয় পার্টির মো. জহিরুল ইসলাম জহির (লাঙ্গল), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মঞ্জুর রহমান মজনু (মশাল), জাকের পার্টির মোক্তার হোসেন (গোলাপ ফুল), বাংলাদেশ কংগ্রেস পার্টির রূপা রায় চৌধুরী (ডাব)। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির জহিরুল ইসলাম জহির (লাঙ্গল) স্বতন্ত্র প্রার্থী মীর এনায়েত হোসেন মন্টুকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনে ছয় জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাবেক এমপি অনুপম শাহজাহান জয়ের (নৌকা) সঙ্গে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাবেক এমপি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর (গামছা) মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এই আসনের বর্তমান এমপি জোয়াহেরুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা আওয়ামী লীগের প্রার্থী অনুপম শাহজাহান জয়ের পক্ষে কাজ না করে নীরব ভূমিকায় রয়েছেন। এজন্য চরম বেকায়দায় পড়েছেন নৌকার প্রার্থী। বর্তমান এমপি জোয়াহেরুল ইসলামের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক এমপি অনুপম শাহজাহানকে জয় পেতে ভুগতে হবে। এই আসনের সাবেক এমপি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী গত সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময়ের চেয়ে এবার কাদের সিদ্দিকীর নির্বাচনি মাঠ বেশ শক্ত। ভোটের মাঠ দখলে দুই জনে প্রায় সমান সমান। এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি ভোটযুদ্ধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই দুই প্রার্থী ছাড়াও জাতীয় পার্টির রেজাউল করিম (লাঙ্গল), তৃণমূল বিএনপির পারুল (সোনালী আঁশ), বিকল্পধারার আবুল হাশেম (কুলা) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোস্তফা কামাল (ডাব) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রসঙ্গত, আটটি আসনে মোট ভোটার ৩১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ৩০৩ ও নারী ভোটার ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ৩৪৯ জন। তাদের মধ্যে ২০ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন।
Published on: 2024-01-04 05:09:11.341259 +0100 CET

------------ Previous News ------------