বাংলা ট্রিবিউন
বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুন: নিখোঁজদের এখনও খুঁজছেন স্বজনরা

বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুন: নিখোঁজদের এখনও খুঁজছেন স্বজনরা

রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগে গত ৫ জানুয়ারি রাতে। দুর্বৃত্তের দেওয়া ওই আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় চারটি তাজা প্রাণ। আহত হন অনেকে। পুড়ে যায় কয়েকটি বগি। অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস, আসেন যাত্রীদের স্বজনরা। একটা সময় আগুন নিভেও যায়। কিন্তু ট্রেনে চার যাত্রীকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের খোঁজে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরছেন স্বজনরা। এদিকে পুড়ে অঙ্গার হওয়া চারটি মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। এখন পর্যন্ত তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আর যারা নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছেন, তাদের ও পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ সংগ্রহ করেছে কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাব অ্যানালিস্ট আহমেদ ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ চার ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরাও ডিএনএ নমুনা দিয়ে গেছেন। তাদের রক্ত ও হাত থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো আজ মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন পেতে তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগতে পারে। তারপরও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রতিবেদন দেওয়া হবে। রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, গোপীবাগ ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে চারটি মরদেহের দাবিদার এখন পর্যন্ত চার পরিবার। তাদের দাবি অনুযায়ী নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন আবু তালহা, চন্দ্রিমা চৌধুরী সৌমি, এলিনা ও নাতাশা জেসমি। সোমবার (৮ জানুয়ারি) সৌমির পরিবার ছাড়াও নিখোঁজ আবু তালহার স্বজন ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। এ ছাড়া আজ নিখোঁজ আরও দুজনের স্বজন ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। আবু তালহার বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের বড়ইচারা গ্রামে। তার বাবা মো. আবদুল হক মণ্ডল বলেন, ‘ঢাকায় এমন কোনও হাসপাতাল নেই, যেখানে ছেলের সন্ধান করিনি। আমার মনে হয় সে জীবিত নেই। তাকে খুঁজে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আবেদন করেছি। ডিএনএ নমুনা দিয়েছি সিআইডিতে।’ গতকাল সোমবার (৮ জানুয়ারি) সিআইডি কার্যালয়ে মাকে নিয়ে ডিএনএ নমুনা দিতে আসেন নিখোঁজ চন্দ্রিমা চৌধুরী সৌমির ভাই চিকিৎসক দিবাকর চৌধুরী। চন্দ্রিমা চৌধুরী সৌমি রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের চিত্তরঞ্জন চৌধুরীর মেয়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সৌমির ভাই দিবাকর বলেন, ‘আমরা এখনও চন্দ্রিমাকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় আছি। তাকে যেন এভাবে (লাশ) ফেরত পেতে না হয়।’ নিখোঁজ এলিনা ইয়াসমিনের স্বামী সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত শুক্রবার রাতে তার ছয় মাসের ছেলে আরফান হোসেনকে নিয়ে রাজবাড়ী থেকে বেনাপোল এক্সপ্রেসে ঢাকায় ফিরছিলেন এলিনা। রাজধানীর গোপীবাগে ট্রেনে আগুন লাগার পর এলিনা তাকে কল করেন। এরপর থেকে তার আর খোঁজ মেলেনি। সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেসের ‘চ’ বগিতে ৫১ থেকে ৫৪ নম্বর— এই চার সিটের একটিতে ছিল এলিনা। ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর ৯টা ১০ মিনিটে সে আমাকে ফোন দেয়। এ সময় আশপাশ থেকে মানুষের কান্নাকাটি-চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যায়। এর মধ্যে এলিনা কই হারালো জানি না। সাজ্জাদ রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। এলিনা রাজবাড়ী শহরের লক্ষ্মীকোল গ্রামের মৃত সাইদুর রহমান বাবুর মেয়ে। গত ২৭ ডিসেম্বর তার বাবার মৃত্যু হলে তারা রাজবাড়ীতে যান। পরে অফিসের জরুরি কাজে তাদের রেখেই ঢাকায় চলে আসেন সাজ্জাদ। সর্বশেষ শুক্রবার মামাতো বোনের সঙ্গে এলিনা ঢাকায় ফিরছিলেন। ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে সবাই নামতে পারলেও এলিনার খোঁজ নেই। নিখোঁজ আরেকজন নাতাশা জেসমিন রাজধানীর ওয়ারীর একাডেমিয়া স্কুলের শিক্ষক। গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি ফরিদপুর থেকে ঢাকাগামী বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠেন। তার স্বামী আসিফ খানের সঙ্গে ট্রেনে ওঠার পর নাতাশা নারিন্দায় তার মাকে ফোন করে ঢাকায় ফেরার কথা জানান। তবে সে রাতে নাতাশা আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। ট্রেনের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হন তিনি। তার পরিবার তাকে স্থানীয় হাসপাতালে খুঁজে না পেয়ে পরদিন সকালে রেললাইনে খুঁজতে যান। কিন্তু সেখানেও খোঁজ মেলেনি তার। একই ঘটনায় নাতাশার স্বামী গুরুতর দগ্ধ হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তিনি জানেন না স্ত্রী নাতাশার খবর। নাতাশার বোন শাহীন নাসরিন বলেন, ট্রেনে আগুন দেওয়ার পর থেকে আমার বোন নিখোঁজ এবং আমরা কেউ জানি না সে কোথায় আছে। জানি না আমার বোন বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) অগ্নিকাণ্ডের পরের দিন শনিবার (৬ জানুয়ারি) বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) এস এম নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানায় ট্রেনে আগুন ধরিয়ে নাশকতা ও যাত্রী হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় এ মামলা করেন তিনি। পরে বিএনপি নেতা জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবীসহ আট জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ডিবির দাবি, এ ঘটনায় বিএনপির এই নেতাকর্মীরা জড়িত। নবী এ ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা। এ ছাড়া ভিডিও কনফারেন্সে যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম ও সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এই নাশকতা ঘটানো হয় দাবি করেন ডিবি। এ প্রসঙ্গে ও মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জড়িতদের খোঁজে বের করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। আমাদের ধারণা আগুন ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে যেকোনও একটা জায়গা থেকে হতে পারে। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারেনি। কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই। এ জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারি রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগে। এতে ঘটনাস্থল থেকে চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় আহত হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি রয়েছেন আর ও ১০ জন।
Published on: 2024-01-09 17:09:36.858701 +0100 CET

------------ Previous News ------------