বাংলা ট্রিবিউন
‘ভ্যানিটি প্রকাশক’ কি বাড়ছে?

‘ভ্যানিটি প্রকাশক’ কি বাড়ছে?

বইমেলা এলে প্রতিবারই নতুন নতুন লেখকের বই আসে। কারা নতুন লেখক, তাদের কীভাবে প্রকাশকরা পান আর কেন তাদের লেখা প্রকাশ করেন— এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক আজকের না। এবারের মেলার শুরু থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে এ আলাপ চলছে— টাকা দিয়ে বই প্রকাশের কারণে মানহীন বই বাড়ছে কিনা? পাঠাকের চেয়ে লেখকের সংখ্যা বেড়ে গেলো কিনা? প্রশ্নের জবাবে প্রকাশকরা পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন— নতুন লেখকের বই প্রকাশ করে ব্যবসাটা নিশ্চিত হবে, প্রকাশক সেটা নিশ্চিত হবেন কী করে? ফলে তার প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মটা লেখককে দিচ্ছেন টাকার বিনিময়ে, এ ধরনের ভ্যানিটি প্রকাশনা সংস্থা বিশ্বব্যাপী রয়েছে। ভ্যানিটি পাবলিশিংয়ে লেখক বা প্রকাশকের বিব্রত হওয়ার কারণ নেই। প্রকাশকরা বলছেন, লেখার বিষয়বস্তু ও মান বিবেচনায় পাণ্ডুলিপি বাছাই যেমন হয়, অনুরোধের বইও কিছু করতে হয়। তবে প্রকাশনা যেহেতু ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠতে পারেনি, কিছু শর্ত দিয়ে টাকা নিয়ে বই প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত লেখক পাণ্ডুলিপি দেন এবং সেটার ওপর ভিত্তি করে যে দাম নির্ধারিত হয় সেই দামে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কপি প্রকাশকের কাছ থেকে কিনে নেওয়ার চুক্তি করেন। আরেক ধরনের চুক্তির কথাও প্রকাশকরা বলছেন, লেখকরা বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার সময় কত কপি প্রকাশ হবে সেটার খরচ দিয়ে দেন। এক্ষেত্রে লেখক কেবল প্রকাশনী সংস্থার নামটির জন্যেই টাকা দিয়ে থাকেন। তবে এসবক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বিত্তশালীরাই এগিয়ে থাকেন। লেখার মান থাকলেও যারা এই অর্থ দিতে পারেন না, তাদেরকে নিজের লেখার মানের ভালো-মন্দ প্রকাশককে বুঝানোর চেষ্টা করতে হয়। ভ্যানিটি প্রেস বা ভ্যানিটি প্রকাশক, কখনও কখনও ভর্তুকি প্রকাশক, একটি প্রকাশনা সংস্থা যেখানে লেখক বইটি প্রকাশ করার জন্য অর্থ প্রদান করেন এবং একটি সীমাবদ্ধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন যার মধ্যে লেখকের অধিকারের অংশটি বেশি থাকে। কিন্তু পশ্চিমা দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের ভ্যানিটি ধরনের পার্থক্য আছে বেশকিছু। যেহেতু লেখক থেকে পুরো টাকা নিয়ে নেওয়া হয় সেহেতু মার্কেটিংয়ে খুব বেশি আগ্রহী নন পশ্চিমা প্রকাশকরা। তবে টাকা নিয়ে বই প্রকাশ করলেও বাংলাদেশি প্রকাশকরা বই প্রদর্শনী থেকে শুরু করে বিপণনের নানা ক্ষেত্রে কোনও কার্পণ্য রাখেন না। তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে নতুন লেখকদের বই প্রকাশ করেন আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গণি। তিনি বলেন, লেখার মান, বিষয় ও অনুরোধ তিন প্রকারের ওপর নতুন লেখক নির্ধারণ করা হয়। লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা প্রকাশককে টাকা দেন তারা কেন দেন? তাদের লেখার মান কি ভালো নয়? মানসম্মত প্রকাশকরা নিজের বিনিয়োগে বই করেন সেটা যেমন সত্য, টাকা নিয়ে নতুনদের বই করা সেটাও আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত। একজন লেখককে আপনি জানেন না, তার লেখা পাঠক গ্রহণ করবেন কিনা জানেন না, সেখানে প্রকাশক সহজে বিনিয়োগ করতে চান না। টাকা দেওয়া ছাড়াও নির্দিষ্ট সংখ্যক বইয়ের কপি কিনে নেওয়ার শর্ত সাপেক্ষে বই করেন প্রকাশকরা। আমাদের এখানে লেখকরা পত্রপত্রিকায় লেখার আগেই বই লিখে ফেলেন। ফলে প্রকাশকের দিক থেকে নির্ধারণে বেশ সমস্যা হয়। ভ্যানিটি পাবলিশিংয়ে লেখক বা প্রকাশকের বিব্রত হওয়ার কারণ নেই। এবং একটি দুটি বাদে বেশিরভাগ প্রকাশনায় এ ধরনের বই নেই, এটা বলার এখন সুযোগ কম। প্রকাশকের বই কোনগুলো প্রশ্ন তুলে নিজেই উত্তর দেন খন্দকার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, যে বইতে আমার শতভাগ বিনিয়োগ সেটা আমার বই। তার বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে সব আমার নিজের রুচি ও পছন্দ মোতাবেক হয়ে থাকে। এর বাইরে নতুন লেখকদের বই বের করার ক্ষেত্রেও তার লেখার মান দেখা হয় অবশ্যই। কিন্তু বিশ্বজোড়া ভ্যানিটি প্রকাশক বলে একটি ব্যাপার আছে, যারা লেখকের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে বই প্রকাশ করে থাকেন। একজন নতুন লেখক তার লেখা নিয়ে কোথায় যাবেন, আর সেই লেখা নিজ বিনিয়োগে ছেপে প্রকাশক কীভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখবে— ফলে লেখকের সহযোগিতায় বই প্রকাশ হয়। যেখানে লেখকের পেছনে প্রতিষ্ঠানটিকে লগ্নি করা হয়। আমাদের দেশে ফিকশন বইয়ের ক্রেতা নেই। ফিকশন বিক্রি হয় লেখকের চেহারা দেখে। তারা যদি মানহীন লেখা লেখে, বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলো সেগুলো ছাপে এবং সেসবই বিক্রি হয়। ফলে যিনি নতুন, লিখছেন ভালো, তার বই প্রকাশ করলেও বিক্রির তালিকায় ঢুকতে পারে না। তখন প্রকাশকের প্রতিষ্ঠানটি তিনি ব্যবহার করেন আর সেটির জন্য তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। বিশ্বজোড়া এইটা পরিচিত প্র্যাকটিস।
Published on: 2024-02-10 05:15:47.795082 +0100 CET

------------ Previous News ------------