বাংলা ট্রিবিউন
অস্ত্রের আঘাতে চোখ বেরিয়ে যায় হাসানের, ‘হত্যাকারীদের’ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

অস্ত্রের আঘাতে চোখ বেরিয়ে যায় হাসানের, ‘হত্যাকারীদের’ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

জুনিয়রকে মারধরের ঘটনা মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য ডেকে সিলেট নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আবুল হাসানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এতে চোখ গলে বের হয়ে যায়। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন দক্ষিণ সুরমা থানার পরিদর্শক আবুল হোসেন। মামলার এজাহারের সঙ্গে সুরতহাল প্রতিবেদন থানায় জমা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহত আবুল হাসান (২৪) সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কাপনা গ্রামের আউয়াল মিয়ার ছেলে। পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ সুরমার মোমিনখলা এলাকায় বসবাস করতেন। হাসান সিলেট সরকারি কলেজের অনার্স প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাকারীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাসানের শরীরের অধিকাংশ স্থানে ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত। মাথার ডান পাশের তিন ইঞ্চি ও পেছনের চার ইঞ্চিজুড়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথার বাঁ পাশে ভারী অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ডান ও বাঁ পাশের চোখে মারাত্মক জখম। গুরুতর আঘাতের কারণে বাঁ চোখ গলে বের হয়ে যায় এবং নাকে জমাট বাঁধা রক্ত ছিল। বাঁ উরুর তিন ইঞ্চিজুড়ে ছিল কাটা। মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি রাতে মোমিনখলার একটি মাদ্রাসায় ওয়াজ-মাহফিলে যান আবুল হাসান। সেখানে জুনিয়র-সিনিয়র নিয়ে নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি আবু দারাদা জিহাদ তামি ও তার ভাই ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদ জিহাদ জামির সঙ্গে হাসানের কথা কাটাকাটি হয়। তাৎক্ষণিক বিষয়টি মীমাংসাও করা হয়। সেই বিরোধের জেরে ২৪ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে বাইপাস এলাকায় হাসানের অনুসারী সানিকে (১৮) মারধর করেন তামি ও জামি। এই মারধরের কারণ জানতে চান হাসান। তখন ঘটনাটি মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য ২৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টায় হাসানকে মোমিনখলার শাহজালাল এন্টারপ্রাইজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে গেলেই ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালান তামি ও জামিসহ তাদের অনুসারীরা। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা হাসানকে উদ্ধার করে সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ ফেব্রুয়ারি বিকালে তার মৃত্যু হয়। পরদিন ৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন নিহতের বড় ভাই আবু সাঈদ। মামলায় অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন দক্ষিণ সুরমার কায়েস্তারাইল এলাকার জিহাদুর রহমান মিঠুর ছেলে আবু দারাদা জিহাদ তামি (২৫), তার ভাই আবু দাউদ জিহাদ জামি (২২), দক্ষিণ সুরমার মুছারগাঁও এলাকার মরম আলীর ছেলে জামিল (২২), কায়েস্তারাইল এলাকার শফিক মিয়ার ছেলে ফাহিম (২২), একই এলাকার আশিকুর রহমান টিটুর ছেলে মাহাদী (২৪), মুছারগাঁও এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে সিয়াম (২১), বারখলা এলাকার লিয়াকত আলীর ছেলে টিপুল (৩২), নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার দুল্লি এলাকার রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে আবুল কালাম রিপন (১৯) ও মুছারগাঁও এলাকার ফাহিম (২২)। এর মধ্যে আবুল কালাম রিপনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বর্তমানে রিপন জামিনে রয়েছেন। তবে বাকি আসামিরা এখনও গ্রেফতার হননি। মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণ সুরমা থানার পরিদর্শক আবুল হোসেন বলেন, ‘সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যু ও আঘাতের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করে মামলার এজাহারের সঙ্গে থানায় জমা দেওয়া হয়েছে। পরে এটি আদালতে জমা দেওয়া হবে।’ আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে আবুল হোসেন বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে আসামিরা পলাতক। তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো ঘটনা তদন্তের আগে এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’ তবে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।’ একই কথা বলেছেন দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়ারদৌস হাসান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়েছি আমরা। আসামিরা পলাতক। তাদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিমসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। রিপন নামে একজনকে গ্রেফতার করা হলেও জামিন পেয়েছেন।’ হাসানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হলেও এখন পর্যন্ত মামলার প্রধান আসামিসহ এজাহারভুক্তদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ, এমনটি জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী তাজউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আসামিদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলে ঘটনায় কারা জড়িত, তা স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসবে।’ আসামিরা গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মামলার বাদী আবু সাঈদ বলেন, ‘দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে হাসান ছিল সবার ছোট। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সংসারের খরচ জোগান দিতো। তার মৃত্যুতে এখন বেকায়দায় পড়েছি আমরা। ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ তৎপর হলে আসামিরা গ্রেফতার হয়ে যেতো। ভাই হত্যার ন্যায়বিচার চাই আমি। সেইসঙ্গে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
Published on: 2024-02-13 05:12:48.30025 +0100 CET

------------ Previous News ------------