বাংলা ট্রিবিউন
প্রেম কি রসায়ন নাকি ব্যাকরণ

প্রেম কি রসায়ন নাকি ব্যাকরণ

‘প্রেমে পড়া বারণ, কারণে অকারণ, আঙুলে আঙুল রাখলেও, হাত ধরা বারণ’—কেউ যখন প্রেমে পড়ে তখন আশপাশের মানুষ যতই যুক্তি হাজির করুক, বারণ করুক, সাবধান করুক—সে বারণ কেউ কি মানে? এই যে অপরিচিত কারোর জন্য নিজের আত্মার আত্মীয়দেরও বিশ্বাস করতে না চাওয়া, এটা কি শুধুই কারোর আচরণগত? নাকি তার মস্তিষ্ক তখন বিজ্ঞান-নিয়ন্ত্রিত। প্রেম কি হিসাব-নিকাশ, নাকি বিজ্ঞান? বা অনেকে আছেন বারবার প্রেমে পড়েন—এটা কি কেবল ‘খাসলত, নাকি এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে? প্রেমের উৎপত্তি হৃদয়ে নাকি মস্তিষ্কে? প্রেম কারণে-অকারণে হয় ও ভাঙে, নাকি এর নাটাই অন্যখানে? মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, ভালোবাসা শুধু মনের বন্ধন নয়, এতে দুটি মনের যে পরিবর্তন ঘটে, তার যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। যখন কাউকে ভালো লাগে তখন মস্তিষ্কে রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ হয়। কিন্তু গবেষকরা এখনও বের করতে পারেননি, ‘ডিম আগে না মুরগি আগে।’ অর্থাৎ আবেগ তৈরি হলে নিউরোট্রান্সমিটার ঘটে, নাকি নিউরোট্রান্সমিটার ঘটার কারণে প্রেম হয়—তা এখনও নিশ্চিত বলা যায় না। *প্রেম তবে হৃদয়ে নয়* যুক্তরাষ্ট্রের রটার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলেন ফিসারের একটি গবেষণা সব জায়গায় উল্লেখ করা হয়। ২০০৫ সালে করা ওই গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, প্রেমের তিনটি স্তর রয়েছে। এই তিনটি স্তরের প্রতিটি স্তরই ভিন্ন ভিন্ন হরমোন ও রাসায়নিক পদার্থের কারণে পরিচালিত হয়। স্তরগুলো হলো— ভালোবাসার ইচ্ছে, আকর্ষণ ও সংযুক্তি। প্রেমের প্রথম স্তরে যখন কাউকে ভালো লাগে, তখন তাকে ভালোবাসার ইচ্ছে থেকে ছেলেদের ক্ষেত্রে টেসট্রোন ও মেয়েদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসৃত হয়। দ্বিতীয় স্তরে কাউকে দীর্ঘদিন ধরে ভালো লাগার ফলে তার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণবোধ সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই স্তরের সঙ্গে তিনটি নিউরোট্রান্সমিটার জড়িত। এড্রিনালিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন। নিউরোট্রান্সমিটার হলো এক ধরনের এন্ডোজেন রাসায়নিক—যা এক স্নায়ুকোষ থেকে অপর স্নায়ুকোষে সংকেত দেয়। তাহলে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফল প্রেম, সেই প্রেম উবেই বা যায় কেন, প্রশ্নে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রেম কেন কমে আসে তার মানসিক, সামাজিক ও জৈবিক ব্যাখ্যা আছে। প্রেমের সম্পর্কে আগ্রহ, নৈকট্য ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকার ব্যাপার থাকে। প্রেমবোধ নষ্ট হয় যখন কিনা সেই ভালো লাগাগুলো যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করা হয়। নিউরো ট্রান্সমিটারের তারতম্য হলে প্রেমবোধ হারায়—তবে এটাও নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। আগে রাসায়নিক পরিবর্তন হয় এবং তার ভিত্তিতে প্রেম হয় বা না-হয়, নাকি আগে প্রেমের শুরু হলে, তবেই রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, সে আলাপ নিষ্পত্তি হয়নি।’ *কেন প্রথম প্রেম ভোলে না, গভীর বলে?* প্রচলিত কথা হলো, প্রথম প্রেম মানুষ ভোলে না। এটা কি এই কারণে যে সেই প্রেমটা বেশি গভীর? মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, যা কিছু প্রথম সেটি মনে দাগ কেটে যায়। সেটা প্রথম অনুভূতি। সেই একই অনুভূতি যখন বারবার হয়, সেটা তার চেনা অনুভূতি, সেটার সঙ্গে ডিল করতে সে জানে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী যে গবেষণার কথা বলা হয়—সেটি যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট কলেজের মনোবিজ্ঞানী জেফারসন সিংগারের। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষের ১৫ থেকে ২৬ বছর বয়সের মধ্যে মস্তিষ্কে কিছু আকস্মিক স্মৃতির একটি বিষয় থাকে। আকস্মিক স্মৃতির পরিমাণ যাদের বেশি, তারা ভুলতে বেশি সময় নেয়।’ *জানেন কী, কখন কে কোথায় প্রেমে পড়বে* হেলেন ফিসার সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখেছেন, ভালোবাসার উত্তেজনার ফলে তাদের মধ্যে উচ্চমানের ডোপামিন নিঃসরণ হয়েছে। এই রাসায়নিক পদার্থটি ব্যক্তির মধ্যে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।  ফিসার জানান, ডোপামিনের নিঃসরণ বেশি হলে শক্তি বাড়ে, ঘুম ও খাওয়ার চাহিদা কমে যায়, মনোযোগ বাড়ে। সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ এই হরমোনটিই নির্ধারণ করে যে কেন ও কখন আপনি প্রেমে পড়বেন। ফিসার দাবি করেছেন বটে, কিন্তু এখনও নিষ্পত্তি হয়নি উল্লেখ করে ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রেমে পড়ার প্রাথমিক যে বিষয়গুলো বলা হয়, তার মধ্য দিয়ে যখন কেউ যায়, তার হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়, যখন সে সেই সম্পর্ক থেকে সরতে চায়—তখন ঠিক উল্টো প্রক্রিয়ায় যায় বলে মনে করা হয়। একইসঙ্গে শরীরে কেমিক্যালের পরিবর্তনে সেটা সাড়া দেয়।’ আহ্ছানিয়া মিশনের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখি গাঙ্গুলী বলেন, ‘প্রেম মনের বিষয় হলেও বিজ্ঞানের বাইরে নয়। যখন কেউ প্রেমে পড়ে, তখন ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ হয়, ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হয়, আনন্দ জন্ম নেয়। মনোবিজ্ঞান হলো আচরণবিদ্যা। এখন যে প্রেম দেখেন সেগুলো বেশিরভাগই সিচুয়েশনশিপ। এর মধ্যে কমিটমেন্টের জায়গা নেই বললেই চলে। মানুষ অন্য মানুষের সাময়িক যা ভালো লাগছে, যা তাকে ভালো সময় কাটানোর নিশ্চয়তা দিচ্ছে—সেখানেই সম্পর্কে জড়াচ্ছে। কিন্তু সম্পর্ক হওয়ার পরে সে যা ভেবেছিল, তার সঙ্গে মেলে না যখন, ধারণাগত জায়গা যখন পরিস্থিতির সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে—তখন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটতে থাকে, ডোপামিন কমতে থাকে।’ মনের কথা একেবারেই পুরোটা হরমোন দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান না মনোরোগ বিশ্লেষক মেখলা সরকার। তিনি সামাজিক ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় প্রেমকে জানার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘প্রেমে ইমোশনাল যোগ তৈরি হয় এবং মানসিক জৈবিক বিষয় থাকে। বাহ্যিকভাবে ভালো লেগে গেলেও তার সঙ্গে না মেশা পর্যন্ত যুক্তি দিয়ে আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারি না আমরা। প্রত্যেক মানুষের কল্পনায় থাকে—সে কেমন মানুষ চায়। রোমান্টিক মানুষ নিয়ে নানান গল্প তৈরি হয় বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কল্পনার মানুষের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে যখন মেলে না, তখন ঘটে বিপত্তি। এই বিভেদ বেশি হলে একটা স্টেজে তীব্রতা কমে যায়। উল্টোদিকে, প্রেম শুরুর পরে আমরা অনেক অসতর্ক আচরণ করি। রিয়েল লাইফ রিলেশনের ভেতর গেলে নিজেকে উপস্থাপনে মনোযোগী থাকি না। ভেতরের জিনিস বেরিয়ে আসে যখন, তখন সেটা ঠিক আমার মতো না হলে আমরা সাধারণত গ্রহণ করতে চাই না। হরমোন নিঃসরণে যে উপাদানগুলো হেল্প করে, সেগুলো অনুপস্থিত হতে শুরু করে। ফলে ওই হরমোন কমে যায়। প্রেম আদতে বিজ্ঞান।’.
Published on: 2024-02-14 05:13:11.511165 +0100 CET

------------ Previous News ------------