বাংলা ট্রিবিউন
৩ বছরেও শুরু হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণিসম্পদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ

৩ বছরেও শুরু হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণিসম্পদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ

তিন বছরেও শুরু হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র প্রাণিসম্পদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (আইএলএসটি) নির্মাণকাজ। ফলে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর হস্তক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০২০ সালে বরিশালের আমানতগঞ্জে ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। আমানতগঞ্জে সরকারি হাঁস-মুরগির খামারের অভ্যন্তরে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অব্যবহৃত জমি থেকে পাঁচ একর প্রতিষ্ঠানটির জন্য বরাদ্দ করে দেয় মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর অবকাঠামো নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বাছাই শেষে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির অনুমোদন পায়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। সেইসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ওই বছরের শেষ ভাগে কাজ শুরু করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ করে দেন সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। তখন নগর ভবন থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কিংবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ বন্ধ রাখতে কোনও চিঠি দেওয়া হয়নি। শুধু মেয়র মৌখিকভাবে নিষেধ করেছেন। সেই থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ আছে। বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প পরিচালক ছাড়াও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের বিভাগীয় পরিচালক ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করলে সিটি মেয়রের মৌখিক নির্দেশে কাজ বন্ধ রাখার কথা স্বীকার করেছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্র জানায়, অধিদফতরের স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় অফিসসহ মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর সেখানে থেকে জেলা প্রশাসনকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সে আলোকে প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গেলেও কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় একাধিক একাডেমিক ভবন, ছাত্রছাত্রী হোস্টেল, অফিস ভবন, টিচার্স ডরমিটরি, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, হেলথ কেয়ার সেন্টার এবং অত্যাধুনিক প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ৪০ জন শিক্ষার্থী প্রাণিসম্পদের ওপর ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেতেন। এখানে রাজস্ব খাতে ৫০ জন জনবল নিয়োগ ছাড়াও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরও ২৫ জনের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণিসম্পদ চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের সূচনা হতো। এখান থেকে পাস করার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি ফার্মে চাকরির সুযোগ পেতেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি দুধ, ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ দক্ষিণাঞ্চলে এটি হতো প্রাণিসম্পদ খাতের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘কাজ শুরুর আগে প্রকল্পের কর্মকর্তারা সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে দেখা না করায় এবং অনুমতি না নেওয়ায় কাজে বাধা দেন। একদিন রাতের বেলায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন  মেয়র। ওই স্থানে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানটি হবে না বলে জানিয়ে দেন। এ অবস্থায় কাজ রেখে চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে মেয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনও কাজ হয়নি।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, ‘যে জমিতে প্রতিষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল, সেটি জলাশয়। এ কারণে তখনকার মেয়র সেখানে বালু ভরাট ও ভবন নির্মাণে বাধা দেন। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। মেয়র চাচ্ছিলেন নগরী অথবা সদর উপজেলার অন্যত্র প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ হোক। পরে কাজ হয়নি। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’ যেকোনো উন্নয়নকাজ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে উল্লেখ করে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ ফারুক শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান বরিশালে হলে অনেক শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পেতো। সেখান থেকে দক্ষ জনশক্তি বের হয়ে দেশের কাজে লাগতো। আমার চেষ্টা থাকবে, যেকোনো মূল্যে আগের স্থানে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের। এজন্য মন্ত্রণালয়ে কথা বলবো।’ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সাবেক মেয়রের অহেতুক হস্তক্ষেপের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র প্রাণিসম্পদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটি তার সমস্যা ছিল। যা এখনও শুরু করা যায়নি। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বশীদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ শুরুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।’ কাজ শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়নি। এখনও চেষ্টা চলছে স্থাপনের। আশা করছি, চলতি বছর নির্মাণকাজ শুরু করতে পারবো আমরা।’
Published on: 2024-02-18 03:12:21.936148 +0100 CET

------------ Previous News ------------