বাংলা ট্রিবিউন
বইমেলা: সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বনাম বাংলা একাডেমি চত্বর

বইমেলা: সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বনাম বাংলা একাডেমি চত্বর

একুশে বইমেলা ২০১৪ সালের পর কেবল যে, দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে তা নয়, এ যেন দুই প্রজন্মের ভেতর সুতো দিয়ে দাগ কেটে দেওয়া। মানুষ বেড়েছে, প্রকাশনা সংস্থা বেড়েছে, মেলায় তাদের অংশগ্রহণের প্রবণতাও বেড়েছে। ফলে বড় জায়গার বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু কোথাও কি টান পড়েছে সাহিত্য আড্ডায়? কিংবা বই নিয়ে মেলার ভাবনায় অন্যকিছু ডুকে পড়লো কিনা! কয়েক প্রজন্মের কথা শুনবো। কোন বইমেলা তাদের টানে, কেন টানে? সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বনাম বাংলা একাডেমি চত্বর— কোথায় তাদের স্বস্তি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার অর্ধেক চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণবন্ত। সেখানে লেখক, পাঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভিড় ছিল। ওইটুকু মাঠেই সুজনেরা জায়গা করে নিতেন। এত আলিশান উপস্থাপনা হয়তো ছিল না, কিন্তু বই নিয়ে ভাবনা ছিল। তেমনটাই বলছেন কেউ কেউ। ভিন্ন ভাবনাও আছে, হালে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বেড়ে গেছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার একটি অংশ না এনে উপায় ছিল না। শুরু থেকেই প্রাণবন্ত এবারের বইমেলা। যদিও এখনও পর্যন্ত বেচাকেনার হিসাব মেলানো ভার। তবে প্রতিদিনই লেখক-পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখরিত থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। এ বছরও দুই ভাগে বসেছে মেলা— বড় অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং অপর অংশ বাংলা একাডেমির চত্বরে। মেলার দুই অংশের চিত্র একেবারে ভিন্ন। শুরু থেকে রোজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলা প্রাণোচ্ছল থাকলেও বাংলা একাডেমি চত্বরে যেন মেলা নেই! বিভিন্ন প্রজন্মের লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মতে, মেলা কোথায় হলো— তার চেয়ে মেলার ব্যবস্থাপনাটা খুব জরুরি। এবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০টি প্রতিষ্ঠানের ১৭৩টি স্টল ও একটি প্যাভিলিয়ন রয়েছে। এই প্রাঙ্গণে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় সবকিছু তাও নয়। বিশেষ করে সেমিনারটি এখানেই হয় রোজ। কিন্তু নেই দর্শনার্থীদের ভিড়। অবসর সময় কাটাচ্ছেন একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকা স্টলের বিক্রয়কর্মীরা। আবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার বিশাল আয়োজন—খাবারের দোকান, শিশুদের জায়গা, সবকিছুর উপস্থিতি থাকলেও ভিড়টা ঠিক বইমেলাকেন্দ্রিক নয়। সেলফি তোলা, খেয়ে-দেয়ে বাসায় ফেরা মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফটোগ্রাফার আক্কাস মাহমুদ বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলায়, কিন্তু কোথায় যেন কিছু টান রয়ে যায়। আমার কাছে আশির দশকের মেলা, তার প্রস্তুতি অন্যরকম ছিল। এখনকার মেলায় অনেক কিছু আছে, কিন্তু অনেককে একত্রিত করে যে একটা আবিষ্কার, মেলায় একটা কবিতার বই বের হবে, তা নিয়ে কোথাও যদি আলোচনা হয়, সেই অপেক্ষা এখন আর নেই।’ বাংলা একাডেমি চত্বরে আগের একুশে বইমেলা, আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এখনকার বইমেলার মধ্যে কোনও পার্থক্য খু্ঁজে পান কিনা, প্রশ্নে ভাষাচিত্রের প্রকাশক খন্দকার সোহেল বলেন, ‘বাংলা একাডেমি চত্বরে অনুষ্ঠিত একুশে বইমেলা ছিল প্রকৃত লেখক, প্রকাশক, পাঠক, লিটলম্যাগ কর্মীদের প্রাণের মেলা। প্রকৃত লেখকরা সেখানে সম্মানের পাত্র ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত বইমেলা হলো— সেলফিবাজ, ভাইরাল রোগে আক্রান্ত তথাগত সোশ্যাল মিডিয়াবাজদের বইমেলা। প্রকৃত লেখক-প্রকাশকরা এখানে টিকে থাকার লড়াই করছেন।’ বইমেলা যখন বাংলা একাডেমির ভেতর ছিল, সেটা কি ভালো ছিল, নাকি এখন যেভাবে আছে? আপনার কি মনে হয়— স্পেস বাড়াতে গিয়ে বইমেলা মান হারিয়েছে, সাহিত্যের ও সাহিত্যিকদের মধ্যে যে টান ছিল, সেটা এখন কমেছে? এসব প্রশ্নের জবাবে তরুণ লেখক ও শিক্ষক উম্মে ফারহানা বলেন, ‘পরিসর বাড়াতেই হতো। জনসংখ্যা বাড়ছে, প্রকাশনা সংস্থা বেড়েছে, ফলে পরিসর বেড়ে যাওয়া সমস্যা না। এত বড় জায়গায় কোথায় কোন স্টল— সেটা নিয়ে কমিউনিকেশনের সমস্যা হয়, অনেকে বলে। আমার কাছে সেটাও সমস্যা না। খাবারের দোকান আছে, উৎসব উদযাপনে সেটাকেও ঝামেলা মনে হয় না। মনে রাখা দরকার, কেবল বই কেনার বিষয় হলে এখন আর মেলাতে যাওয়ার দরকার হয় না। মানুষ এখন ওখানে যায় উৎসবের আমেজের জন্য।’ টিকটক জেনারেশন নিয়ে মানুষের বিরক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিকটকারদের স্ট্যাটাস সিম্বল হলো দামী হোটেল ও ভালো রেস্টুরেন্টে চেকইন দেওয়া। তারা যদি বইমেলায় গিয়ে চেকইন দেয় সেটা খারাপ না, তাদের মাধ্যমে এই জেনারেশন জানতে পারছে। তবে সাহিত্য আলোচনার জায়গা আরেকটু বাড়ানো দরকার। লেখক- পাঠকের যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ আছে।’ তবে মেলা ‘বাণিজ্য’ করতে গিয়ে আজকের রূপ পেয়েছে বলে মনে করেন লেখক ও প্রকাশক মঈনুল আহসান সাবের। তিনি মনে করেন না— মেলা ঘর বদলালে নষ্ট হয়! তিনি বলেন, ‘ওখানে জায়গা নেই। তাই সোহরাওয়ার্দীর দিকে আসা। মেলা নষ্ট হয়েছে আমাদের অধিকতর বেনিয়া ও তরল মনোভাবের জন্য।’
Published on: 2024-02-20 17:03:37.115043 +0100 CET

------------ Previous News ------------