বাংলা ট্রিবিউন
বায়ুদূষণ: একগুচ্ছ উদ্যোগ, তবু বারবার শীর্ষে ঢাকা

বায়ুদূষণ: একগুচ্ছ উদ্যোগ, তবু বারবার শীর্ষে ঢাকা

বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণে সরকারের একগুচ্ছ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে পরিবেশ অধিদফতর। তারপরও বাতাসে দূষণের মাত্রার কারণে রাজধানী ঢাকা কয়েক দিন ধরেই শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসছে। নতুনভাবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে বায়ুমান নিয়ন্ত্রণে ১০০ দিনের মধ্যে ঢাকার আশপাশের সব ইটভাটা বন্ধ করা ছাড়াও বেশ কিছু বিশেষ উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। *বায়ুদূষণের শীর্ষ অবস্থানে রাজধানী* বায়ুদূষণের মানমাত্রা উপস্থাপনকারী সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের মানমাত্রা অনুযায়ী, সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানী ঢাকা ছিল শীর্ষ অবস্থানে। এদিন মাত্রা ছিল ৩৩৫, রবিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে যা ছিল ৩৯৪। এর আগের দিন শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) মাত্রা ছিল ২২৭। তিন দিনই দিনের একটা বড় সময়জুড়ে রাজধানী ঢাকা ছিল বায়ুদূষণের শীর্ষ অবস্থানে। *মাত্রা অনুযায়ী পরিবেশ* বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের মাত্রা ৫১ থেকে ১০০ হলে তাকে ‘মাঝারি’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ মানের বায়ু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ মাত্রাকে ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। মাত্রা ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু। মাত্রা ২০১ থেকে ৩০০ হলে তাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু ধরা হয়। ৩০১ থেকে তার বেশি হলে সেই মাত্রাকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়। *সরকারি উদ্যোগ* বাংলাদেশ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ সরকারের জারি করা এই বিধিমালা অনুযায়ী দূষণ নিয়ন্ত্রণের অভিযানগুলো বাস্তবায়নের কাজ করছে পরিবেশ অধিদফতর। *বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি* বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এই কমিটির সভাপতি হচ্ছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। জানা যায়, ২৭ সদস্যের এই কমিটি এ পর্যন্ত দুটি বৈঠক করেছে। বৈঠকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বেশি কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়নে কাজ করছে পরিবেশ অধিদফতর। *জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা* জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার একটি খসড়া তৈরি কাজ চলছে। আগামী এপ্রিলের মধ্যে এই কাজ চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে যেসব কাজ হচ্ছে, সেগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্যই এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। *পরিবেশমন্ত্রীর ১০০ দিনের কর্মসূচি* সাবের হোসেন চৌধুরী পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০০ দিনের বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নেওয়ার ঘোষণা দেন। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে আছে বায়ুদূষণের বেশ কিছু কার্যক্রম আছে। যেমন: ১০০ দিনের মধ্যে ঢাকার আশপাশের ৫০০ ইটভাটা বন্ধ করা হবে। পরিবেশ অধিদফতর তাদের অভিযানের মাধ্যমে বেশ কিছু ইটভাটা বন্ধ করলেও, পুরোপুরি সব বন্ধ করতে পারছিল না। এই ঘোষণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বায়ুদূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী এই ইটভাটা বন্ধ হলে দূষণের বড় অংশ কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইটের পরিবর্তে ব্লক পরিবেশমন্ত্রীর ১০০ দিনের মধ্যে ইটভাটা বন্ধের পাশাপাশি ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহার বৃদ্ধির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাস্তা বাদে অন্য নির্মাণকাজে ইট বাদ দিয়ে ব্লক ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে অধিদফতর। *বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে অভিযান* বায়ুদূষণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদফতরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের অভিযান প্রতিদিনই হচ্ছে। জরিমানা করা হচ্ছে নিয়মিত। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নওগাঁর আত্রাইয়ে পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনা করায় একটি ইটভাটাকে এক লাখ জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে ইটভাটার সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালানো হচ্ছে। *এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স* সম্প্রতি পরিবেশ অধিদফতর বায়ুর মান দেখার জন্য এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে অধিদফতরের ওয়েবসাইটে গিয়ে ঢাকার বায়ুর মান দেখা সম্ভব। অধিদফতরের ৩৩টি স্টেশনের মধ্যে ১৬টি স্টেশনের ডাটা নিয়ে রিয়েল টাইম (এখন কী অবস্থা) বায়ুর অবস্থা দেখা সম্ভব। এ হিসাবে সোমবার রাত ৯টায় রাজধানী ঢাকার মানমাত্রা ছিল ২২৩। *সতর্কতামূলক ম্যাসেজ* একিউআইয়ে বায়ুর মানমাত্রা যদি ৩০০-এর ওপরে উঠে যায়, তাহলে ওয়েবসাইটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্য সতর্ক বার্তা স্ক্রলে দেখা যাবে। আবার ৩০০-এর নিয়ে নামলে সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। এই বার্তায় সাধারণত বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে করণীয় বিষয়ে সতর্ক করা হবে। প্রসঙ্গত, মানমাত্রা ৩০০-এর ওপরে উঠলে সেই পরিবেশকে দুর্যোগপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন বিশেষজ্ঞরা। *বায়ুদূষণ নির্দেশিকা* জানা যায়, এই নির্দেশিকায় দফা আছে ২২টি। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কোন মন্ত্রণালয়ের কার কী করণীয়, সেই বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী মন্ত্রণালয়েগুলো তাদের কাজ করে বলে জানা যায়। সরকারের এসব উদ্যোগের বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এয়ার কোয়ালিটি) মো. জিয়াউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট আন্তরিক। আমরা সরকারের নির্দেশে জোরেশোরেই কাজ করে যাচ্ছি। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি বায়ুদূষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের মধ্যে নির্মাণকাজে ইটের ব্যবহার বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও সেটি করা যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের মধ্যে সব সরকারি নির্মাণকাজে ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহারের বিষয়ে কাজ করার লক্ষ ঠিক করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। সরকারি এত উদ্যোগের পরও কেন কমছে না বায়ুদূষণ, জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ মো. কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ে নানা কাজের কথা বললেও মাঠের কাজটা জরুরি। সেই কাজটাই হচ্ছে না। যেসব কারণে বাতাসে দূষণ হয়, সেটার জন্য যেসব অধিদফতর বা সংস্থা বা মন্ত্রণালয় দায়ী, তাদের সঙ্গেই পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে বসতে হবে। যেমন: রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে, সে জন্য যদি ওয়াসা করে, তাহলে ওয়াসার সঙ্গে বসেই বিষয়টি সমাধান করতে হবে, যাতে তারা খোঁড়াখুঁড়ির পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়। একইভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসতে হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এভাবে বায়ুদূষণের জন্য দায়ী বিষয়গুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি দায়ী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে। পরিবেশ অধিদফতরের একার পক্ষে এসব কাজ করা সম্ভব নয়। সবাইকে সমন্বিতভাবেই করতে হবে। তা না হলে ফল পাওয়া যাবে না।
Published on: 2024-02-22 05:24:16.820268 +0100 CET

------------ Previous News ------------