বাংলা ট্রিবিউন
টাউট কারা

টাউট কারা

টাউট শব্দের বাংলা অর্থ ভদ্রবেশী প্রতারক। দালাল, মামলা মোকদ্দমার তদবিরকারী, ঠগ, বাটপারের আরেক সম্বোধন ‘টাউট’। সাধারণভাবে আমরা চলতি সম্পর্কে কেউ কথা দিয়ে কথা না রাখলেও তাকে টাউট সম্বোধন করি। কিন্তু আইনি ভাষায় টাউটের সংজ্ঞা নির্ধারণ রয়েছে বহুকাল আগে থেকে। ‘টাউট আইন ১৮৭৯’ দিয়ে টাউট কীভাবে ধরা হবে তা নির্ধারণ হলেও সময়ের পরিবর্তনে টাউট এখন ‘আরও টাউট’ হয়েছে, তার কাজের পরিধি বেড়েছে। সে কারণে প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো ‘টাউট আইন ১৮৭৯’ হালনাগাদ করতে নতুন খসড়া করেছে সরকার। ‘টাউট’ সম্পর্কে আইনে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সে অনুসারে, নিজে আইনজীবী না হয়েও কোনও আইনজীবী বা আইন পেশাজীবীদের ন্যায় যদি কোনও ব্যক্তি বিচারপ্রার্থীদের মামলা বা মামলা সংক্রান্ত কোনও কাজ অর্থের বিনিময়ে গ্রহণ করে, বা কোনও বিচারপ্রার্থীকে এ বিষয়ে প্রস্তাব দেয়, কোনও বিচারপ্রার্থী প্রতিষ্ঠানের মামলা বা মামলা সংক্রান্ত কোনও কাজ অর্থের বিনিময়ে গ্রহণ করে, বা এ বিষয়ে প্রস্তাব দেয়, অথবা কোনও দেওয়ানি বা ফৌজদারি বা রাজস্ব আদালত বা সরকারি দফতর, বা কোনও পেশাজীবীর দফতর থেকে সেবা প্রদানের আইনি পদ্ধতি থাকার পরও দ্রুত ও সহজে কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রলোভনে অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করে, বা অর্থ গ্রহণের চেষ্টা করে, তবে তিনি ‘টাউট’ বলে গণ্য হবেন। এ আইনের আওতায় থাকছে আদালত, থানা, হাসপাতাল, রেজিস্ট্রি, পাসপোর্ট অফিস ও সরকারি লাইসেন্স প্রদানকারী দফতর। এছাড়া রোড ট্রান্সপোর্ট অফিস, রেলওয়ে স্টেশন, টার্মিনাল, পাবলিক রিসোর্ট ও সরকারি সেবা প্রদানকারী যেকোনও অফিসে দালালদের তৎপরতার বিষয়ও আইনটিতে উল্লেখ থাকবে। নতুন আইনে কেবল টাউটের কাজের পরিধি বেড়েছে তাই নয়, এতে অর্থদণ্ড ও সাজার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। আইনের দণ্ডের ধারায় বলা আছে, কেউ যদি এসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তবে তিনি অপরাধ করেছেন গণ্য হবে এবং অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। এবং এই আইনের কোনও ধারার অধীন কোনও ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হলে এবং পরবর্তী সময়ে তিনি একই অপরাধ আবারও ঘটালে, যে ধারায় দোষী সাব্যস্ত হবেন, ওই ধারায় নির্ধারিত দণ্ডের দ্বিগুণ পরিমাণ দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। জানা যায়, আগের আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ শাস্তি তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড, যা অপর্যাপ্ত। তাই বিভিন্ন দফতরের টাউট বা দালালদের প্রকাশ্য তালিকা প্রণয়নের বিধান রাখার পাশাপাশি সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার এই আইনে ব্রোকারের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্রোকার তিনি, যিনি কমিশনের ভিত্তিতে অপরপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের জন্য সুবিধার ব্যবস্থা করেন, বা মতবিরোধের অবসান ঘটান, বা যিনি একজন ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে লেনদেনের ব্যবস্থা করেন। ধারা ৯ নম্বরে বলা আছে, কোনও আদালতের বিচারক বা কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট অফিসের ‘উপযুক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা প্রতিনিধি’ বা পুলিশ অফিসার বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এই আইন অনুযায়ী কেউ টাউটের কাজ করছে সন্দেহ করলে—সংশ্লিষ্ট দফতরে বা প্রাঙ্গণে আগতদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে দফতরে বা প্রাঙ্গণে ঘন ঘন দেখা যাওয়ার কারণ ও তার পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইতে পারবেন। কেন এই আইন পরিবর্তন দরকার জরুরি হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘দেড়শত বছর আগের বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতা এক নয়, এমনকি তদবির বলেন, দালালি বলেন, কিংবা নেগোশিয়েশন— সবকিছুর ধরন বদলেছে। ফলে সংজ্ঞা থেকে শুরু করে টাউটের কাজের পরিধি ও যদি সে আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করে, তাহলে তার অপরাধ ও সব বিষয়ই পরিবর্তনের দরকার আছে। আইনটি সময়োপযোগী করে যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে সেবাগ্রহীতা সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবেন বলেও মনে করেন তিনি। অনেকে টাউট শব্দ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক খায়ের মাহমুদ বলেন, ‘টাউটের বাংলা প্রতিশব্দ যদি প্রতারণা, জালিয়াতি বা দালালি করি—এই তিনটিই অন্য আইনে ভুক্ত অপরাধ হিসেবে আছে। প্রতারণা ও জালিয়াতি পেনালকোডে রয়েছে, দালাল আইনও আমাদের এখানে অন্তর্ভুক্ত আছে। এই আইনটি করা হয়েছিল যারা বিভিন্ন অফিস আদালতে কিছু টাকার বিনিময়ে সেবা দেন, দেনদরবারের চেষ্টা করেন তাদের জন্য। ফলে শুনতে খারাপ হলেও কাজটা বিবেচনায় নিয়ে এই শব্দের বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ নেই।’
Published on: 2024-02-25 18:17:28.674858 +0100 CET

------------ Previous News ------------