বাংলা ট্রিবিউন
মালয়েশিয়ার এক প্রতিষ্ঠানে কাজে গিয়ে বিপাকে শতাধিক বাংলাদেশি

মালয়েশিয়ার এক প্রতিষ্ঠানে কাজে গিয়ে বিপাকে শতাধিক বাংলাদেশি

‘দালাল আমাদের বিদেশে পাঠাইছে, বলছে ভালো কাজ দিবে। এখন এখানে এসে আমাদের বন্দি অবস্থায় রাখা হইছে। আমার আব্বা ব্রেইন স্ট্রোক করছেন, এখন প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় পড়ে আছে ভাই’—মোবাইল ফোনে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন সাইফুল (ছদ্মনাম) নামে এক যুবক। শুধু সাইফুলই নন, তার মতো অন্তত ১০০ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পেমবিনান রিকোলার এসডিএন বিএইচডি নামে একটি কোম্পানিতে বৈধভাবে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিন মাস ধরে খাবার, ঘুমানোর জায়গা, এমনকি টয়লেট সংকটের মধ্যে ছিলেন তারা। অধিকার কর্মীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তাদের সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) উদ্ধার করেছে দেশটির মানবসম্পদ বিভাগ। সেইসঙ্গে কোম্পানিটিকেও কালো তালিকাভুক্ত করে মানবপাচার আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগেও মালয়েশিয়ায় চাকরির ফাঁদে পড়ে ৭৩৩ বাংলাদেশি কর্মীর মানবেতর জীবনযাপন বিষয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিল বাংলা ট্রিবিউন। সেখানকার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের (২০২৩) নভেম্বর মাসে ওই কোম্পানির কাজ নিয়ে ১০০ জনেরও বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। একেকজন কর্মীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অভিবাসন ফি আদায় করা হয়, যা সরকার নির্ধারিত ফি'র চেয়ে চার থেকে সাতগুণ বেশি। এই কর্মীরা জানিয়েছেন, তারা গত ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি মুসা ইন্টারন্যাশনালের অধীনে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে নামার পর তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে নেয় কোম্পানিটির একজন চীনা ও বাংলাদেশি প্রতিনিধি। এরপর পাসপোর্ট ফেরত চাইলে ২ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত দাবি করে তারা। ভুক্তভোগী কর্মী সাইফুল জানান, মাজেদ মাস্টার নামে তার গ্রামের এক শিক্ষক তাকে মালয়েশিয়ায় চাকরির কথা জানান। এর আগে সাইফুল এখানে ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। মাজেদ মাস্টার তাকে ভালো চাকরি এবং বেতনের স্বপ্ন দেখান। সাইফুল বলেন, ‘আমি তাকে বিশ্বাস করে টাকা ধার করে এখানে আসছি। শুধু আমি না, আমার মতো আরও ৫০ জন তার মিথ্যা কথার ফাঁদে পড়ে টাকা দিয়ে এখানে চলে আসছে। তাকে আমরা ৫ লাখ টাকা করে দিয়েছি।’ কয়েকজনের কাছ থেকে ধার করে টাকাগুলোর সংস্থান করেছিলেন জানিয়ে সাইফুল বলেন, ‘ভাবছিলাম কাজ করে মাসে মাসে শোধ করে দিবো। এখন কাজ না থাকায় একটা টাকাও শোধ করতে পারি নাই। এখানে আমরা এক ফ্লাইটে একসঙ্গে ৬৪ জন আসছিলাম। বিমানবন্দর থেকে আমাদের রিসিভ করে হুলুলাঙ্গা নামক একটি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমরা এক মাস ছিলাম, এরপর চেরাস নামে একটা এলাকায় আমাদের নিয়ে আসে। আমাদের ভিসার মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যায়, আমাদের পাসপোর্ট তাদের কাছে। আমরা বর্তমানে মালয়েশিয়ায় কাগজপত্রহীন।’ নিজের আকুতি তুলে ধরে এই যুবক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন, আমাদের এই জীবন থেকে রক্ষা করেন।’ ভুক্তভোগী আরেক কর্মী সোহাগ বলেন, ‘এখানে আমাদের একটি তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্টে ১০৪ জনকে একসঙ্গে রাখা হয়েছিল। যেখানে টয়লেট ছিল মাত্র একটা। এক রুমে ১৭ জন, আরেক রুমে ১৫ জন আর আরেক রুমে ৯ জন, আর বাকিরা হলরুমের মেঝেতে থাকতো। রাত ৩টায়ও টয়লেটের সামনে লম্বা লাইন থাকতো। এর আগে হুলুলাঙ্গাতে দোতলা গুদামে আমরা ১৩৪ জন ছিলাম একসঙ্গে। সেখানে আমাদের জন্য টয়লেট ছিল ৩টা। আমাদের খাবার দেওয়া হয়, কিন্তু সেটা খাওয়ার অযোগ্য আর অপর্যাপ্ত। কোম্পানির বাংলাদেশি প্রতিনিধির নাম মেজবাহ, সে আমাদের নির্যাতন করে। থাকার এমন বাজে অবস্থা, আর এখানে এত গরম যে আমাদের শুধু লুঙ্গি পরে ঘুমাতে হয়।’ গত কয়েক মাস ধরেই এমন মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। একপর্যায়ে খোঁজ পেয়ে মালয়েশিয়ার অধিকার কর্মীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এরপর বিস্তারিত তথ্য নিয়ে সে দেশের মানবসম্পদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানান ব্রিটিশ অধিকার কর্মী অ্যান্ডি হল। মালয়েশিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যমে তাদের নিয়ে খবরও প্রকাশ হয়। এরপর মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় শ্রম বিভাগের সহায়তায় কর্মীদের অবস্থান চিহ্নিত করে সেখানে অভিযান চালায় এবং তাদের উদ্ধার করে বলে এক বিবৃতিতে জানানো হয়। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নসুশন বিন ইসমাইল এবং মানবসম্পদমন্ত্রী স্টিভেন সিম চি কেয়ং বলেন, চেরাসে ৯৩ জন বাংলাদেশি কর্মীর বিষয়ে অনলাইন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত শুরু করেছে এবং তদন্তে দেখা গেছে কর্মীরা নিয়োগকর্তার কাছে কাজ পায়নি এবং একটি যথাযথ বাসস্থান না দিয়ে খারাপ পরিবেশে তাদের রাখা হয়েছিল। নিয়োগকর্তারা আশ্রয় এবং খাবারের ক্ষেত্রে এই কর্মীদের কল্যাণের যত্ন নিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয় জানায়, রেকর্ড অনুযায়ী ২০২৩ সালের নভেম্বরে পেমবিনান রিকোলার এসডিএন বিএইচডি নামক কোম্পানি তাদের কাজের জন্য নিয়ে আসে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (কেডিএন) পুত্রজায়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের সহায়তায় সেখানে একটি অভিযান পরিচালনা করেছে এবং এর সঙ্গে অ্যান্টি-ট্র্যাফিকিং ইন পার্সনস কাউন্সিলের (এনএসও এমএপিও) জাতীয় কৌশলগত অফিসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। পেনিনসুলার মালয়েশিয়ার শ্রম বিভাগের মাধ্যমে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় শ্রম আইনে এর সঙ্গে জড়িত নিয়োগকারীদের ওপর তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি সব উদ্ধারকৃত ভিকটিমকে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ পাওয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার আগে নথিপত্রের জন্য জিআইএম পুত্রজায়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার বিদ্যমান শ্রম আইন, কর্মসংস্থান আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কর্মীদের বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবেও বলে জানানো হয়। পাশাপাশি কোম্পানিটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানবিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। এই প্রসঙ্গে অ্যান্ডি হল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে আমার সাম্প্রতিক অভিযোগের দ্রুত ও নিষ্পত্তিমূলক যৌথ তদন্তকে আমি স্বাগত জানাই। এছাড়া স্থানীয় গণমাধ্যমেও চেরাসে আটকা পড়া ও নিঃস্ব শ্রমিকদের জোরপূর্বক শ্রমের জন্য মালয়েশিয়ায় অবৈধ অপরাধী সিন্ডিকেটের পাচারের বিষয় প্রকাশ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (পুত্রজায়ার কেডিএন/ইমিগ্রেশন বিভাগ), কাউন্সিল ফর ট্র্যাফিকিং ইন পার্সনস (এনএসও এমএপিও) এবং মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের (কেএসএম) জাতীয় কৌশলগত কার্যালয়ের কর্মকর্তারা যে তদন্ত চালিয়েছেন তার জন্য আমি যৌথ অভিযানকে সাধুবাদ জানাই। তিনি আরও বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় জোরপূর্বক শ্রমের জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাচার করে একটি অবৈধ অপরাধী সিন্ডিকেট। আরও আঘাতপ্রাপ্ত ভিকটিমদের দ্রুত উদ্ধার করাকে আমি স্বাগত জানাই। আমি আশা করি, এই অপারেশন এবং কেএসএম, এমএপিও এবং কেডিএন-এর চলমান তদন্তের ফলে, এই ক্ষতিগ্রস্তরা বিগত মাসগুলোতে তাদের অপরিসীম দুর্ভোগের জন্য সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাবে। আশা করা যায়, শ্রমিকরা দ্রুত অর্থবহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা পাবে, যাতে তারা তাদের জীবন পুনর্গঠন করতে পারে এবং বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় তাদের অভিবাসনের অভিজ্ঞতা অবশেষে ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক হয় তা নিশ্চিত করা হবে।’ এই সময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘কেডিএন, এমএপিও, কেএসএম এবং বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ সবাই মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা, ভুয়া মালয়েশিয়ান নিয়োগকর্তা এবং আউটসোর্স এজেন্ট, দালাল এবং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় ক্ষেত্রেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একটি সক্রিয় অপরাধী চক্র টাকা নিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের পাচার করছে।’
Published on: 2024-02-27 11:41:42.514551 +0100 CET

------------ Previous News ------------