বাংলা ট্রিবিউন
এবারও চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা, দুর্ভোগে গ্রাহক

এবারও চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা, দুর্ভোগে গ্রাহক

এবারও চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে দেখা দিয়েছে লবণাক্ততা। কোনও কোনও সময় এ লবণাক্ততার হার সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি লবণাক্ততার চাপে কখনও কখনও বন্ধ রাখতে হচ্ছে ওয়াসার পানি সরবরাহকারী প্রকল্পও। গত এক সপ্তাহ ধরে ওয়াসার পানিতে এ সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ওয়াসার গ্রাহকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা দেখা দিয়েছিল। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী লিটারে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম লবণাক্ততা হলে সে পানি খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এটি স্বাস্থের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছর পানিতে যে পরিমাণ লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে এবার তার চেয়েও বেশি দেখা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীতে মিঠা পানির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং সাগরের লবণাক্ত পানি নদীতে ঢুকে পড়ার কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টি কম হওয়ায় নদীতে ঢুকছে সাগরের পানি। জোয়ারের পাশাপাশি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় এ সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত পানি না ছাড়ায় জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে চলতি বছর পানিতে প্রতি লিটারে দুই হাজার ১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। > > > > আরও পড়ুন- > > চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দৈনিক পানির চাহিদা আছে ৫০ কোটি লিটার। বর্তমানে চারটি পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ কোটি লিটার পানি। প্রয়োজনের থেকে নগরবাসী ৫ থেকে ৮ কোটি লিটার পানি কম পাচ্ছে। যে কারণে কিছু কিছু এলাকায় সংকট লেগেই আছে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্পের ফেইজ-১ ও ফেইজ-২ থেকে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে ২৮ দশমিক ৬ কোটি লিটার পানি। শেখ রাসেল পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে ৮ থেকে ৯ কোটি লিটার এবং মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে ৮ থেকে ৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। চারটি প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্পে লবণাক্ততার সমস্যা দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্পে। ৯ কোটি লিটার সক্ষমতার এ প্রকল্পে জোয়ারের সময় এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমায় পানিতে বেশি লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে। চলতি বছর এ প্রকল্পে প্রতি লিটারে দুই হাজার ১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা ধরা পড়েছে। লবণাক্ততার পরিমাণ ৭০০ হলেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এ প্রকল্পে পানি সরবরাহ। একইভাবে লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে মদুনাঘাট শেখ রাসেল পানি শোধনাগার প্রকল্পেও। এটিতেও জোয়ারের পানিতে লবণাক্ততা দেখা দেয়। সে সময় পানি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ওয়াসার আবাসিকে গ্রাহক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ আছে ৭ হাজার ৭৬৭টি। ৭৭০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে সংস্থাটি পানি সরবাহ করে। বেশিরভাগ লাইন পুরোনো হওয়ার কারণে এমনিতেই সংকটে থাকতে হয় গ্রাহকদের। লাইনে লিকেজ বা ছিদ্রের  কারণে পানি নষ্ট হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে এখন সংকট আরও বেশি হচ্ছে। > > > > আরও পড়ুন- > > নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা মহিন উদ্দিন জানান, ‘প্রতি বছর ওয়াসার পানির বিল বাড়ানো হলেও নিরাপদ পানি পাওয়া নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। অনেক সময় পানিতে ময়লার পাশাপাশি দুর্গন্ধও। গত কিছুদিন ধরে নতুন সমস্যা লবণাক্ততা। তার ওপর মিলছে না পর্যাপ্ত পানিও। ওয়াসার পানি নিয়ে সব সময় কোনও না কোনও সমস্যা লেগেই আছে।’ চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্পে লবণাক্ততার সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ প্রকল্পে লবণাক্ততার কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে। একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে মদুনাঘাট শেখ রাসেল পানি শোধনাগার প্রকল্পেও। তবে এ প্রকল্পে লবণাক্ততার সমস্যা কিছুটা কম। লবণাক্ততার কারণে জোয়ারের সময় দুই প্রকল্পে পানি সরবরাহ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এ কারনে গ্রাহক পর্যায়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া নিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হচ্ছে না। সে সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিও হচ্ছে না। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হলে এবং বৃষ্টি হলে লবণাক্ত পানি নদীতে প্রবেশ করতো না। নদীতে এখন মিঠা পানির পরিমাণ কমে জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এ কারণে সমস্যা হচ্ছে। তবে ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা দূর করতে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি সময়সাপেক্ষ।’ শেখ রাসেল পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সৌমিত পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে পানিতে লবণাক্ততা সমস্যা দেখা যাচ্ছে। জোয়ারের সময় লবণাক্ততার সমস্যা বাড়লে পানি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে মোহরা প্রকল্পে লবণাক্ততার যে পরিমাণ সমস্যা হচ্ছে এখনও আমার প্রকল্পে সে পরিমাণ হচ্ছে না।’ > > > > আরও পড়ুন- > > মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লবণাক্ততা সমস্যা গত কিছুদিন ধরে চলছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে এ লবণাক্ততা থাকে না। তবে জোয়ারের সময় এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমার সময় এ সমস্যা দেখা যায়। কখনও কখনও সমস্যা প্রকট হয়।’ এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও নদী গবেষক ড. ইদ্রিস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা সমস্যা অত্যন্ত জটিল। গত বছর প্রতি লিটারে সাড়ে তিন হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা পাওয়া গিয়েছিল। গত বছর ওয়াসার পানি নিয়ে গ্রাহরা যে সমস্যায় পড়েছিল এবার এর চেয়ে আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হবে।’ এ প্রসঙ্গে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএম আবদুজ্জাহের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাঁচটি ইউনিটে ২৪২ মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস পানির স্তর কাপ্তাই লেকে অনেক কমে গেছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়াতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা ছিল ৮৪ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। অথচ এ সময়ে পানির উচ্চতা থাকার কথা ছিল ৯৪ এমএসএল। পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে একটি মাত্র ইউনিট চালু আছে। মঙ্গলবার ১ নম্বর ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৪০ মেগাওয়াট।
Published on: 2024-02-28 08:06:49.82311 +0100 CET

------------ Previous News ------------