বাংলা ট্রিবিউন
টাঙ্গাইল শাড়ি তাহলে এখন কার

টাঙ্গাইল শাড়ি তাহলে এখন কার

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এর আগে ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি নিয়েছে বলে খবর গত সপ্তাহে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়। এখন দুই দেশেরই জিআই হয়েছে টাঙ্গাইল শাড়ি। তাহলে এখন প্রকৃতপক্ষে টাঙ্গাইল শাড়ি কার—ভারত নাকি বাংলাদেশের। ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই নিবন্ধন করার পরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা এ তথ্য জানান। বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপরেই কি টাঙ্গাইল শাড়িতে আর ভারতের জিআই থাকবে না। এ প্রশ্নের জবাবে এই সিনিয়র সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেবল আমাদের জিআই করতে হলে আরও কিছু পথ বাকি। জিআই পেতে হলে পণ্যটি সেই এলাকারই হতে হয়। যেহেতু ভারত পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়িকে আগে জিআই ঘোষণা দিয়েছে, এখন আমাদের দুজনেরই থাকবে। এরপর কিছু আইনগত প্রক্রিয়া আছে, সেগুলোর দিকে আমরা পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে এগোবো। নিয়ম বলছে, যে পণ্যগুলো ভারত ও বাংলাদেশে একইসঙ্গে উৎপাদিত হয় সেগুলোর ক্ষেত্রে আগে জিআইয়ের স্বীকৃতি নেওয়া জরুরি। সীমান্তবর্তী জেলায় যে পণ্য উৎপাদিত হয়, ঠিক সীমানার ওপারে ভারতে সেই একই পণ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। সিলেটের সাতকরা, দিনাজপুরের লিচু, ফজলি আম এসব দুদেশেই হয়। এগুলোর নিজ নিজ দেশে জিআই করতে হবে এবং তারপরে আন্তর্জাতিক বাজারেরটাও করতে হবে। যদি কারোর জিআই নিয়ে যায়, প্রশ্ন তোলে, সেক্ষেত্রে উপযুক্ত নথি-প্রমাণসহ জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) বরাবর অভিযোগ করতে হবে। ততদিন দুই দেশই জিআই শেয়ার করবে জানতে চাইলে সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদেরই থাকবে। যেহেতু তারাও করেছে, কিছু আইনি প্রক্রিয়ায় আমাদের যেতে হতে পারে। ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া ও পূর্ব বর্ধমানে উৎপাদিত পণ্য হিসেবে জিআই নিবন্ধন করেছে। কিন্তু যে তথ্য-প্রমাণ দিতে হয়, সেখানে তাদের থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে। বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার প্রমাণ মেলে ভারতের জিআই আবেদনের তথ্যে। জানা যায়, টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য ২০২০ সালে আবেদন করে পশ্চিমবঙ্গের তন্তুবায়ী সমবায় সমিতি। পর্যবেক্ষণের নানা ধাপ পেরিয়ে গত ২ জানুয়ারি এর স্বীকৃতি দেয় ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস বিভাগ। তাতে টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া ও পূর্ব বর্ধমানের পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেটা প্রমাণ করতে ভারত পারবে না উল্লেখ করে খোদ নদীয়ার ফুলিয়া অঞ্চলের তাঁতিরা বলছেন, আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে এসে এই এলাকায় তাঁত ধরেছি, তারা এইটাকে ভালোবেসে কাজ করেছি এবং টাঙ্গাইল নামটা নিয়েছি। আসলে এই শাড়ি তো বাংলাদেশের। জিআই কেন জরুরি প্রশ্নে বাংলাদেশে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক নীল কমল বসাক বলেন, ‘এটা আমার আইডেনটিটি। আমার কী আছে সেই ঐতিহ্য, সেটা আমি অন্যকে কেন দেবো। শুধু তাই নয়, আমাদের টাঙ্গাইল শাড়ি একটা রফতানি পণ্য। এটা আমি এই নামের বাইরে রফতানি করতে পারবো না যদি এর জিআই অন্য কারও হয়। আমরা ভুলে গেলে চলবে না, দিন যত যাচ্ছে, বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে স্বত্বের বিষয়টি তত গুরুত্ব পাচ্ছে। এ কারণেই জিআই কেউ হারাতে চায় না। কোনও একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের পণ্য হয়ে থাকলে সেই পণ্য ওই অঞ্চলের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও জিআইয়ের স্বীকৃতি বড় ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। আমার সন্তানকে আমি অন্যের উত্তরাধিকার হতে দেখবো এটা ভাবাই যায় না। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বসাক সম্প্রদায়ের বড় অংশই ভারতে চলে যান। সেখানে গিয়ে তারা নদীয়া জেলার ফুলিয়া গ্রাম এবং পূর্ব বর্ধমানের ধাত্রী গ্রাম ও সমুদ্রগড়ে বাস শুরু করেন। সেখানে যাওয়া বসাক পরিবারগুলোর পরের প্রজন্মের তাঁতিরা বলছেন, ফুলিয়ার ঘরে ঘরে সেই তাঁত কাজ শুরু হয়। যেহেতু আমরা টাঙ্গাইল থেকে এসেছি, তাই পরিচিতির জন্য নামটা ব্যবহার করা হতো।
Published on: 2024-02-07 18:25:37.238041 +0100 CET

------------ Previous News ------------