বাংলা ট্রিবিউন
আশায় বুক বাঁধছেন আ.লীগের তরুণ নেতারা

আশায় বুক বাঁধছেন আ.লীগের তরুণ নেতারা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে আওয়ামী লীগ নেতাদের জন্য প্রার্থিতা ‘উন্মুক্ত’ রাখা, রেকর্ড সংখ্যক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং তারা বহাল তবিয়তে থাকায়, আশায় বুক বাঁধছেন দলটির তরুণ নেতারা। বিশেষ করে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, যুবলীগসহ অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে সক্রিয় থাকা নেতারা বলছেন— এবারের সংসদ যেমন অন্যরকম হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও একটা ভিন্নরকম গতি এনেছে। ডজনখানেক আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ পুরনো দল হওয়ায় জ্যেষ্ঠরাই বারবার কমিটিতে স্থান পেয়ে আসছেন, সংসদ সদস্য হচ্ছেন। এবার এই দুটো ক্ষেত্রেই তরুণ নেতাদের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ আগামীতে এই বাস্তবতা উপেক্ষা করতে পারবে না। দলটির সামনের দিনের রাজনীতিতে এটি পরিবর্তন আনবে। সে কারণে তরুণ নেতাদের সক্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনই গতিশীল হচ্ছে আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে টানা তিন বার ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ২২৪টিতে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ৬২ জনের মধ্যে ৫৯ জনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এবার আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয় ৩ হাজার ৩৬২টি। সেই হিসাবে আসনপ্রতি দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ১১ জনের বেশি। ৩০০ আসনের মধ্যে দুটি বাদ রেখে ২৯৮টি আসনে নৌকার প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদের ৭১ জন এমপি বাদ পড়েন। দলটির বাদ পড়া এমপিদের আসন এবং গতবার (২০১৮) জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়া ৩১টি আসন মিলিয়ে মোট ১০২টি আসনে নতুন মুখ মনোনয়ন পেয়েছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ১ হাজার ৮৯৬ জন প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে ২৬৩ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। এবার নির্বাচন ‘উন্মুক্ত’ থাকায় চারশ’র কাছাকাছি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তাদের মধ্যে ২৬৯ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। যাদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া গত সংসদের ২৮ জন এমপি ছিলেন, কয়েকজন তারও আগের সংসদের সদস্য ছিলেন এবং বাকিরা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে সাব্যস্ত করে অতীতে শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতো আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবার বিরোধী জোটবিহীন নির্বাচন জমজমাট করতে দলটি ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হতে উৎসাহিত করেছে। এমনকি তাদের ভোটের আগে-পরে গণভবনে ডেকে মতবিনিময় করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে নিজেদের পাওয়া সংরক্ষিত মহিলা আসনগুলো আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দিয়েছেন স্বতন্ত্র ৬২ জন সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির দুই সদস্য, একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তিন জন সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বেশি বিতর্কিত ও অজনপ্রিয় নেতাদের এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া প্রার্থিতা উন্মুক্ত থাকায় মূলত নৌকার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতারাই ভোটযুদ্ধে ছিলেন। ফলে যাদের অবস্থা ভালো, তারাই জিতে এসেছেন। এর মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ায় দলের ৫৯ জন নেতা স্বতন্ত্র হিসেবে এমপি হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই আগামীতে তাদের যথার্থ মূল্যায়ন করবে দল। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ওপর। তিনি এই বাস্তবতা উপেক্ষা করবেন না বলেই মনে করেন তারা। এবার নিজেদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও নিজ প্রচেষ্টায় জেতা স্বতন্ত্র এমপিদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা। ভোটের পর গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে স্বতন্ত্র এমপিদের আওয়ামী লীগে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডান হাত ও বাঁ হাত দুটোই আমার। স্বতন্ত্ররা আমার দলেরই। আপনারা আমার, আপনারা দলেই আছেন। ঘরের ছেলে ঘরেই আছেন। বিষয়টা দাঁড়িয়েছে— বাড়ি সবার একটা, ঘর হয়েছে দুইটা। আর কিছুই নয়।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ অনেক নেতা এবারের নির্বাচনে একটা ধাক্কা খেয়েছেন। রাজনীতিতে যেহেতু অবসরের প্রবণতা কম, সে কারণে তরুণ নেতারা এবার সুযোগের সদ্বব্যবহার করেছেন। নিজেদের শক্তি, সম্ভাবনা এবং দলের কাছে নিজেদের ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করতে পেরেছেন তারা। নতুন এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া হলে তৃণমূলে সাংগঠনিকভাবে দলও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত মহিলা আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৮টি (দলীয় ৩৮ এবং স্বতন্ত্রদের ১০টি আসন) আসনে প্রার্থী দেয় এবং তারা নির্বাচিত হন। বাকি ২টি পায় জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের ৪৮ জন সংরক্ষিত এমপির মধ্যে ৩৪ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে বসার সুযোগ পেয়েছেন। ৪৮টি আসনে এবার দলটির মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন এক হাজার ৫৪৯ জন। ফলে প্রতিটি আসনের বিপরীতে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা ছিল ৩২ জন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ সংগঠন। এখানে জ্যেষ্ঠরা যেমন আছেন, নতুন নেতৃত্বও আছে। সবাইকে নিয়েই দল এগিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। এবার নির্বাচন উন্মুক্ত থাকায় অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। তাদের তো উপেক্ষা করার উপায় নেই। পুরনো ও নতুন মিলে আওয়ামী লীগ আগামীতে আরও শক্তিশালী হবে, এগিয়ে যাবে।’ এদিকে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধকল সামলে এবার দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিভাগভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের দ্রুত সময়ের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ সব জেলা, উপজেলা ও মহানগর, পৌর আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন সম্পন্ন করা, সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করা এবং তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিরোধ মিটিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ শাখা, ঢাকা জেলা শাখা এবং সব সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে যৌথসভা করেন দলটির শীর্ষ নেতারা। এতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নতুন করে গঠনসহ দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশনা জানিয়ে দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, অন্যান্য সংগঠনে সক্রিয় থাকা নেতা ও আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারা বলছেন, দলীয় প্রধানের নির্দেশনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দলের সব স্তরে তরুণ নেতাদের যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কাজে লাগালে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, দলও সংগঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাকে আওয়ামী লীগ কতটা কাজে লাগাতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে নতুন বাস্তবতা একেবারে উপক্ষে করা সম্ভব হবে না। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা, ৪৯৫টি উপজেলা রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির বেশি জেলা-উপজেলায় কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও যথাসময়ে সম্মেলন হয়নি। ২৭টি জেলা ও মহানগরে কোন্দল বা বিরোধ রয়েছে। আর ১৮টি জেলা ও মহানগরে সম্মেলন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আওয়ামী লীগের দুই জন সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নানা কারণে তরুণ নেতারা কমিটিতে স্থান কম পেয়ে থাকেন। তবে একেবারে যে নতুন নেতৃত্ব আসছে না, তা তো নয়। ‘পুরনো চাল ভাতে বলে’— এটি যেমন ঠিক, তেমনই প্রতি মৌসুমে ‘নতুন চালের পিঠাপুলি’র কথাও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সার্বিক বিবেচনায় তৃণমূলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এই বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়ে সামনে আসছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘তরুণ নেতাদের প্রতি দলের গুরুত্ব সবসময় ছিল, এখনও আছে। এবারের নির্বাচনের কারণে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে, বিষয়টি এমন নয়। তরুণ প্রজন্মকে জায়গা দিতে হয়। কারণ, তারাই আগামী দিনে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। শেখ হাসিনা সব সময়ই  তরুণদের গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।’
Published on: 2024-03-13 08:28:52.460165 +0100 CET

------------ Previous News ------------