বাংলা ট্রিবিউন
কলার হালি ১০ টাকা-ই বিক্রি করেন চাষি, বাজারে ৪০

কলার হালি ১০ টাকা-ই বিক্রি করেন চাষি, বাজারে ৪০

পবিত্র রমজান মাস ঘিরে নীলফামারীতে নিত্যপণ্যের ও কাঁচাবাজার বাজার অস্থির করে তুলেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা বলেছেন, রমজানের আগের দিন যে দোকান থেকে এক হালি কলা ২০ টাকায় কিনেছেন, এখন ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অথচ আগের দামেই বিক্রি করছেন চাষিরা। অবশ্য এর সত্যতা মিলেছে চাষিদের কথায়ও। তারা জানিয়েছেন, আগের দামেই বিক্রি করছেন। একইভাবে রমজান শুরুর আগে নিত্যপণ্যের যে দাম ছিল, প্রত্যেকটির কেজিতে ১০-২০ টাকা করে বেড়েছে। জেলা শহরের কিচেন মার্কেটে দেখা গেছে, খেজুর, গাজর, খিরা, টমেটো, লেবু, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল কিনছেন ক্রেতারা। এর মধ্যে পেঁয়াজ, চিনি ও সয়াবিন তেলের দাম স্বাভাবিক থাকলেও অন্যগুলোর দাম বেড়েছে। বাজার করতে আসা মানুষজন জানিয়েছেন, খেজুর, ছোলা, সব ধরনের ডাল ও কাঁচা বাজারসহ বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে। অনেক পণ্য নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে কলা ও লেবুর দাম। যার দাম তিন দিন আগেও কম ছিল। জেলা শহরের বড় বাজার ট্রাফিক মোড়ে কলা কিনতে আসা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা কোথাও থেমে নেই। ছোট সাইজের এক হালি কলা ৪০ টাকায় কিনলাম। অথচ তিন দিন আগেও এক ডজন কলা ৪০ টাকায় পাওয়া যেতো। একইভাবে এক হালি লেবু ৫০ টাকায় কিনলাম। যার হালি ছিল ১০ টাকা। গ্রামে উৎপাদিত এসব ফলের দাম রোজায় বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। যে যেভাবে পারছে সেভাবে বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের টাকা। দেখে মনে হয়, এসব দেখার কেউ নেই।’ সদরের টুপামারী ইউনিয়নের রামগঞ্জ গ্রামের কলা চাষি জাহির উদ্দিন বলেন, ‘মঙ্গলবারও কলার হালি ১০ টাকায় বিক্রি করেছি। অথচ সেই কলার হালি ওরা ৪০ টাকায় বিক্রি করছে। তারা বলছে চাষিরা দাম বাড়াচ্ছে। আসলে আমাদের এক টাকাও বাড়তি দেওয়া হয় না। দাম বাড়তি চাইলে আমাদের কাছ থেকে কলা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় তারা। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে সবসময় এক দামেই কলা বিক্রি করি আমরা।’ কিচেন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ছোলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়। কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৯০-৯৫ টাকা। হিসাবে কেজিতে বেড়েছে ১৫-২০ টাকা। খেসারির ডালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকায়। যা তিন-চার দিন আগেও ৭০-৮০ টাকা ছিল। এই মার্কেটে বাজার করতে আসা শহরের বাসিন্দা আজগর আলী বুলু বলেন, ‘এখন এক কেজি সাধারণ মানের খেজুর ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ছিল ২৫০-৩০০ টাকা। ভালো মানের খেজুর ৮০০-১৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ৮০০ টাকা ছিল। লাগামহীনভাবে বাড়ছে পণ্যের দাম।’ বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে জানিয়ে শহরের বড় বাজারের মুদি দোকানি আবু সাইদ মিলন মিয়া বলেন, ‘এবার রোজায় ছোলা, খেসারি ডালসহ রমজানের প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে চিনির দাম আগের অবস্থায় আছে। তেলের দাম কমলেও আগের দামের তেল আসছে। আমরা সীমিত লাভে বিক্রি করি।’ রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, ‘রমজানে প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। অথচ আমরা বিক্রি করতে গেলে আগের দামই পাচ্ছি। টাকার সংকেট আমরা খেজুর, পেঁয়াজ, রসুন ও আদা ঠিকমতো কিনতে পারি না। কাউকে কিছু বলতেও পারি না।’ গরুর মাংস কিনতে এসে ৭৫০ টাকা দেখে মুরগির বাজারে গেলেন কৃষক আমির হোসেন। তাও কিনতে পারলেন না। পরে না কিনে বাসায় চলে যান। ১৫ দিন আগে এক কেজি পাকিস্তানি মুরগি বিক্রি হয়েছিল ২৭০ টাকায়। রোজার মাসে সেই মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়। এখানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা। জেলা শহরের সবজি বাজার ঘুরে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি শিম ৩০ টাকায় কিনে ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৬০ টাকায়, ২০ টাকার টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়, মটরশুঁটি ৪০ টাকায় কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করছেন ৬০ টাকায়। এছাড়া গাজর ৪৫-৫০, লম্বা বেগুন ৬০, সাদা গোল বেগুন ৭০, কালো গোল বেগুন ৮০, শসা ৮০, খিরা ৪০, করলা ৮০ টাকায় কিনে বিক্রি করছেন ১২০ টাকা পর্যন্ত। পেঁপে ৩০, মিষ্টি কুমড়া ৩০, ঢ্যাঁড়স ১০০, পটল ৮০, চিচিঙ্গা ৬০, বরবটি ১২০ এবং সজনে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এসব সবজির কেজিতে বেড়েছে ৩০ টাকা। অন্যদিকে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। আদা ২২০-২৪০ টাকা ও রসুন ২২০-২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা রমজানের আগে ১০-২০ টাকা কম ছিল। শহরের খুচরা বাজারের দোকানি বুলু মিয়া বলেন, ‘পাইকারি বাজার থেকে কিনে পরিবহন খরচ, ঘাটতি, পচে যাওয়াসহ সব কিছু পুষিয়ে আমাদের একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। বর্তমানে কাঁচা মরিচ ৮০-১০০, ধনেপাতা ৬০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। প্রতিটি লাউ ৩০, ফুলকপি ৪০, বাঁধাকপি ৩০ টাকায় বিক্রি করছি। রোজার কয়েকদিন আগেও এসব জিনিসের দাম কম ছিল। রোজায় চাহিদা বাড়ায় দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এজন্য আমাদের বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।’ রোজায় বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এটি এম এরশাদ আলম খাঁন বলেন, ‘রোজায় বাজার মনিটরিং অব্যাহত আছে আমাদের। ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে। আসলে রোজাকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। না হয় কেন হঠাৎ করে লেবু ও কলার দাম বেড়ে যাবে। এগুলো প্রতারণা। এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ২৫-২৭ টাকা। তারা পাইকারিতে পাচ্ছেন ৪০-৪৫ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা। এভাবে কৃষক সব পণ্যে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, পাশাপাশি লাভবান হচ্ছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।’
Published on: 2024-03-13 03:08:08.658589 +0100 CET

------------ Previous News ------------