বাংলা ট্রিবিউন
সাগরিকায় শান্তর অধিনায়কোচিত ইনিংসে উড়ে গেলো শ্রীলঙ্কা

সাগরিকায় শান্তর অধিনায়কোচিত ইনিংসে উড়ে গেলো শ্রীলঙ্কা

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা, বাড়তি রোমাঞ্চ। মাঠে দুই দলের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষাতেও থাকে আগ্রাসন। সিলেটে টি-টোয়েন্টি সিরিজেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে সিলেট থেকে চট্টগ্রামে ওয়ানডে সিরিজ ফিরতেই সব যেন পাল্টে গেলো! গ্যালারিতে ছিল না দর্শক। ২২ গজেও মিললো না তেমন ঝাঁজ। তবে মাহিশ থিকশানার বলে শান্তর বাউন্ডারিতে জয়সূচক রান আসতেই মুশফিক ঘুরে যান লঙ্কান ড্রেসিংরুমের দিকে। হাতটাকে মুষ্টিবদ্ধ করে উল্লাস করেছেন। শেষ মুহূর্তে এসে যেন অদেখা ঝাঁজটা শোভা পেলো তার মাধ্যমেই। হয়তো এই শরীরী ভাষাতেই প্রকাশ পেলো সিলেটে লঙ্কানদের ‘টাইমড আউট’ উদযাপনের বদলা! গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে লঙ্কানদের বিপক্ষে শেষবার বাংলাদেশ জিতেছিল। সাকিব আল হাসানের মাধ্যমে ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছিল অদ্ভুত এক আউট। ওই ম্যাচে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের ‘টাইমড আউট’ কাণ্ডে দুই দলের লড়াই রুপ নিয়েছিল ক্লাসিক দ্বৈরথে। তুমুল উত্তেজনার ম্যাচটিতে শেষ হাসি হেসেছিলো বাংলাদেশ-ই। বুধবার লঙ্কানদের সামনে সুযোগ ছিল বিশ্বকাপে হারের বদলা নেওয়ার। কিন্তু শান্তর সেঞ্চুরির পর অভিজ্ঞ মুশফিকের হাফ সেঞ্চুরিতে স্রেফ উড়ে গেছে সফরকারীরা। প্রথম ওয়ানডেতে লঙ্কানদের দেওয়া ২৫৬ রান ৩২ বল হাতে রেখেই ৪ উইকেট হারিয়ে টপকে গেছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা ২২ হাজার। লঙ্কানদের বিপক্ষে মহারণে চট্টগ্রামে দর্শক খরা সবাইকে বিস্মিত করেছে। পুরো স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় হাজার খানেক দর্শক আজকের ম্যাচটি উপভোগ করেছেন। একেতো দুপুরের ম্যাচ, তার মধ্যে রোজা। এই কারণেই কিনা দর্শক উপস্থিতি একেবারেই কম। তবু যারা আজ খেলা দেখতে এসেছেন নিশ্চিতভাবে সত্যিকারের ফ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখেন। রিফাত নামের এক দর্শক সাধারণ গ্যালারিতে বসে পুরো ম্যাচটাই দেখেছেন। শান্ত-মুশফিকরা তাকে নিরাশ করেননি বিধায় দারুণ খুশি এই দর্শক। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমি নিজেও রোজা রেখেছি। তারপরও ম্যাচটা মিস করতে চাইনি। চট্টগ্রামে খেলা হলে আমি মিস করি না। পুরো দিনে আমার এই কষ্টটা সার্থক হয়েছে।’ রিফাতের মতো কাউকেই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়নি। নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের দৃঢ়তায় লঙ্কান সিংহদের এক প্রকার উড়িয়েই দিয়েছে টাইগাররা। যদিও চট্টগ্রামের ব্যাটিং বান্ধব উইকেটে ২৫৬ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে বাংলাদেশ শুরুতেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছিল। সর্বশেষ সিরিজে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওপেনিং করা সৌম্য সরকারের পার্টনার হিসেবে ছিলেন এনামুল হক বিজয়। এবার এনামুলের জায়গায় ওপেন করার সুযোগ পান লিটন দাস। কিন্তু দিলশান মাদুশাঙ্কার অফস্ট্যাম্পের প্রথম বলটি টেনে স্ট্যাম্পে নিয়ে এসে বিপদ ডেকে আনেন তিনি। ৬ষ্ঠ বারের মতো গোল্ডেন ডাকের রেকর্ড গড়ে লিটন আউট হয়েছেন। তার আগে সাতটি গোল্ডেন ডাক নিয়ে আছেন সাবেক নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন। এরপর সৌম্য সরকার ও তাওহীদ হৃদয়ও দ্রুত আউট হয়েছেন। তিন রান করে ফিরেছেন দুইজনই। তাতে ২৩ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। সেখানে থেকে মাহমুদউল্লাহ ও শান্ত মিলে দলের হাল ধরেন। রোজা রেখে মাহমুদউল্লাহ ভালোই খেলছিলেন। দারুণ ফিল্ডিংও করেছেন তিনি। তবে ব্যাটিংয়ে নেমে ক্র্যাম্প করেছেন; হয়তো পানিশূন্যতার কারণেই। এই অবস্থায় সম্ভাবনাময় ইনিংসটি বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারেননি। লাহিরু কুমারার বলে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেওয়ার আগে ৩৭ বলে ৪ চার ও ১ ছক্কায় ৩৭ রানের ইনিংস খেলেছেন অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার। মুশফিক যখন ক্রিজে নামেন বাংলাদেশের দলীয় রান তখন ৯২। অধিনায়ক শান্তর সঙ্গে শুরু হয় উইকেট কিপার এই ব্যাটারের লড়াই। পঞ্চম উইকেটে দু’জন মিলে অবিচ্ছিন্ন ১৬৫ রানের জুটি গড়ে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে গেছেন। ৫২ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় হাফ সেঞ্চুরিতে পৌঁছান শান্ত। পরের পঞ্চাশ তুলতে খেলেছেন ৫৬ বল। লাহিরু কুমারাকে কভার দিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি বাউন্ডারি মেরে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারেও পৌঁছান বাংলাদেশের অধিনায়ক। অধিনায়ক হিসেবে শান্তর এটা প্রথম সেঞ্চুরি, লঙ্কানদের বিপক্ষেও প্রথম। অধিনায়ক হিসেবে সাকিব আল হাসান, মোহাম্মদ আশরাফুল, মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবালও সেঞ্চুরি করেছিলেন। এর আগে শান্ত বিশ্বকাপের টাইমড আউট বিতর্কের ম্যাচে ৯০ রানের ইনিংস খেলে আউট হয়েছিলেন। এর আগে গত অক্টোবরে শ্রীলঙ্কা সিরিজে খেলেছিলেন ৮৯ রানের ইনিংস। দুটি সম্ভাবনাময় সেঞ্চুরির মৃত্যু ঘটলেও, সেই দায় শোধ করতে বেশি সময় অপেক্ষায় রাখেননি শান্ত। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে শান্তর এটি তৃতীয় সেঞ্চুরি। শেষ পর্যন্ত ১২৯ বলে ১৩ চার ও ২ ছক্কায় ১২২ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। একটা সময় রানের গতি ধীর হয়ে পড়েছিল। ২২.৪ ওভার থেকে শুরু করে ৩২.৫ ওভার পর্যন্ত বাংলাদেশ কোন বাউন্ডারি পায়নি। ৬০ বল পর আসালাঙ্কার বলে মুশফিক বাউন্ডারি মেরে সেই খরা কাটিয়েছেন। এক পাশে শান্ত যেমন লঙ্কান বোলারদের ওপর ছড়ি ঘুড়িয়েছেন, অন্য প্রান্তে থেকে অভিজ্ঞ মুশফিকও একই কাজ করেছেন। দুই প্রান্তের ব্যাটারদের দারুণ ব্যাটিংয়েই দিশেহারা হয়ে পড়ে লঙ্কান বোলাররা। শান্তর সেঞ্চুরির দিনে মুশফিক পেয়েছেন ক্যারিয়ারের ৪৯তম হাফ সেঞ্চুরির। ৫৯ বলে ৬ চারে মাইলফলকও স্পর্শ করেন তিনি। ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এটি তার অষ্টম পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংস। ৪৯টি হাফ সেঞ্চুরির পাশাপাশি ৯টি সেঞ্চুরি এসেছে মুশফিকের ব্যাট থেকে। শেষ পর্যন্ত মুশফিক খেলেন অপরাজিত ৭৩ রানের ইনিংস। লঙ্কান বোলারদের মধ্যে মাদুশাঙ্কা সর্বোচ্চ দুটি উইকেট নিয়েছেন। একটি করে উইকেট নিয়েছেন প্রমোদ মাদুশান ও লাহিরু কুমারা। এর আগে টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে দারুণ শুরু করেছিল শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের বোলারদের ছন্নছাড়া বোলিংয়ের সুযোগ নিয়ে প্রথম পাওয়ার প্লেতেই ১ উইকেট হারিয়ে ৭১ রান তুলে ফেলে। তবে ১৩ রানের মধ্যে টপ অর্ডার তিন ব্যাটারকে ফিরিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশ। প্রথম তিনটি উইকেটই তুলে নেন তানজিম হাসান সাকিব। তাসকিন-শরিফুল শুরুতে ছন্দহীন বোলিং করলেও মাঝের ওভারগুলোতে এসে ছন্দ ফিরে পান। লঙ্কানরা যেভাবে শুরু করেছিল, শেষটা সেভাবে করতে পারেনি। শেষ ৯.৫ ওভারে সফরকারীরা ৪০ রান তুলতেই লেজের ৫ উইকেট হারিয়েছে। সবমিলিয়ে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪৮.৫ ওভারে ২৫৫ রান। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৬৭ রানের ইনিংস খেলেছেন জানিথ লিয়ানাগে। অধিনায়ক কুশল মেন্ডিসের ব্যাট থেকে আসে ৫৯ রানের ইনিংস। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে ৪৪ রানে তিন উইকেট নিয়ে জুনিয়র সাকিব দলের সেরা বোলার। এছাড়া শরিফুল ও তাসকিন প্রত্যেকে তিনটি করে উইকেট নিয়েছেন। একটি উইকেট নিয়েছেন অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ।
Published on: 2024-03-13 18:20:08.063514 +0100 CET

------------ Previous News ------------