বাংলা ট্রিবিউন
এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ বছর, শেষ হয়নি বিচার

এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ বছর, শেষ হয়নি বিচার

দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারদিকে মানুষের ছোটাছুটি। আগুনের লেলিহান শিখার সঙ্গে কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে পড়েছে আশপাশের পরিবেশ। ২২তলা একটি ভবনে থাকা কর্মজীবী নারী-পুরুষদের প্রাণ বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা। ভবনের কাচের দেয়াল বেয়ে নামার চেষ্টা অনেকের। হাত ফসকে পড়ে যাচ্ছেন তাদের কেউ কেউ। নিচে তাদের আর্তনাদ আর মানুষের হায় হায় চিৎকার। মুহূর্তেই ছুটে আসেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। সুউচ্চভবন হওয়ায় হিমশিম খেতে থাকেন উদ্ধারকর্মীরা। হেলিকপ্টার দিয়ে ছাদের ওপরে পানি ছেটানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু কপ্টারের বাতাসে আগুন বেড়ে যাওয়ায় সে চেষ্টাও বিফলে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীদের আবার হোস পাইপ দিয়ে পানি ছোড়া আর আটকে পড়াদের উদ্ধারচেষ্টা। তীব্র তাপে গলে যেতে থাকে ভবনের বাইরের কাচ। আগুন থেকে রক্ষা পেতে কেউ কেউ লাফিয়ে পড়েন মাটিতে। চারদিকে গগনবিদারী চিৎকার। আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। যেন সিনেমার কোনও দৃশ্য! ২০১৯ সালের আজকের (২৮ মার্চ) এই দিনে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র বনানীর ফারুক-রূপায়ন (এফআর) টাওয়ারে। এ অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জনের প্রাণহানি হয়। এই ঘটনার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটির বিচারকাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। একই ঘটনায় নকশা জালিয়াতি ও ভুল নকশা অনুমোদনের অভিযোগে দুদকের দুই মামলার বিচার শুরু হলেও সাক্ষ্যগ্রহণে তেমন অগ্রগতি নেই। বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন দত্ত ২৭ জন নিহতের ঘটনায় বাদী হয়ে ওই বছরের ৩০ মার্চ একটি মামলা দায়ের করেন। ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক সমীর চন্দ্র সূত্রধর আদালতে এই মামলায় চার্জশিট দেন। চার্জশিটে এস এম এইচ আই ফারুক, তাজভীরুল ইসলাম, সেলিম উল্লাহ, এ এ মনিরুজ্জামান, সৈয়দ আমিনুর রহমান, ওয়ারদা ইকবাল, কাজী মাহমুদুন নবী ও রফিকুল ইসলামকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খানকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। মামলাটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত না হওয়ায় পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন ঢাকার সিএমএম আদালত। এরপর পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে। গত ২২ জানুয়ারি মামলাটি তদন্ত করে আদালতে একই আসামিদের অভিযুক্ত করে ও লিয়াকত আলী খান মুকুলকে অব্যাহতির সুপারিশ করে চার্জশিট জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই এর ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রফিকুল ইসলাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রশিদুল আলমের আদালত পিবিআই এর দেওয়া ৮ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন। এই ৮ আসামি বিভিন্ন সময় আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। বর্তমানে সব আসামি জামিনে রয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ মার্চ মামলাটির তারিখ ধার্য ছিল। মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রশিদুল আলমের আদালত নথিটি সিএমএম বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেন। সিএমএম মামলাটি পরবর্তী বিচারের জন্য বদলির আদেশ দেবেন। মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মামলাটির দুই দফা তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট এসেছে। মামলা বিচারের জন্যও প্রস্তুত হয়ে গেছে। চার্জ গঠন করে বিচার শুরু হবে। আমরা চেষ্টা করবো সাক্ষীদের হাজির করে যতদ্রুত সম্ভব মামলার বিচারকাজ শেষ করার। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবু সাঈদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামলার চার্জশিটে উল্লেখ আছে ১৫ তলা ভবনের রাজউক কর্তৃক যে অনুমোদন দেওয়া আছে, তা ঠিক আছে। এটা পরিষ্কার উল্লেখ আছে। আর যে ব্যক্তি ল্যান্ডওনার, উনি ১৫ থেকে ১৮ তলা পর্যন্ত রূপায়ন গ্রুপকে এক্সটেনশন করতে দিয়ে দেয়। রূপায়ন গ্রুপ রাজউক থেকে ১৮ তলা পর্যন্ত যে পারমিশন এনেছে, এটাও সঠিক আছে। সেটা চার্জশিটেও উল্লেখ আছে। এখানে যে ল্যান্ড ওনার, তার তো কোনও অপরাধ নেই। তিনি তো সঠিকভাবে স্যাংশন এনে বা পারমিশন এনে করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিন তলা এক্সটেনশন করার জন্য রূপায়নকে দেওয়া হয়। এখানে জমির মালিকের দায় নাই। আর তিনি তো মারা গেছেন। আর রূপায়ন গ্রুপ তো সঠিকভাবে পারমিশন এনে করেছে। পরবর্তী সময়ে তা হ্যান্ডওভারও করেছে। হ্যান্ডওভারের পর তার তো আর কোনও দায় থাকে না। পরবর্তী সময়ে কী করতে হবে, এটা ডেভেলপারের আর থাকে না। এ কারণে মুকুল সাহেবকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। আর বাকিদের মধ্যে ওয়ারদা নামে একজন নারী আছেন। কমিটির একজন সদস্য হিসেবে তার নাম আছে, এটা তিনি জানেনও না। কোনও মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন, এমন কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ পাইনি। আর ওয়ারদা দেশে থাকেন না। তিনি আরও বলেন, ‘রাজউকের অনেক লোক, উচ্চপদস্থ যারা অনুমোদন দিয়েছেন, তাদের কাউকে আসামি করা হয়নি। এটা সঠিকভাবে তদন্তই হয়নি। তদন্তে আগেও যা দেওয়া হয়েছে, পরেও তাই দিয়েছে। তেমন কোনও রদবদল হয়নি। মুকুল সাহেব, এখানে তার আর কোনও হেডেক নেই। ফারুক সাহেব তো ল্যান্ড দিয়েই দিয়েছেন। আর ওয়ারদা তো আসামিই হন না। আশা করছি, আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন। হয়রানি থেকে মুক্ত হবেন। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, এ ভবনের জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক। টাওয়ারের বর্ধিত অংশের মালিক তাসভিরুল ইসলাম, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ওরফে মুকুল এবং এফ আর টাওয়ার বিল্ডিং ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা অসৎ উদ্দেশ্যে আর্থিক সুবিধার লোভে নির্মাণ বিধিমালা না মানায় এফআর টাওয়ারে এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ১৯৯৬ সালে এফআর টাওয়ারের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত নকশায় ভবনের উচ্চতা ১৮ তলা। ‍কিন্তু নির্মাণ বিধিমালা না মানায় ভবনটি ২৩ তলা করা হয়েছে। পরে ২০০৫ সালে এফআর টাওয়ারের মালিকপক্ষ রাজউকের কাছে আরেকটি নকশা জমা দেয়। ১৯৯৬ সালে মূল যে নকশা রাজউক অনুমোদন দিয়েছিল তার সঙ্গে নির্মিত ভবনটির অনেক বিচ্যুতি রয়েছে। আগুন লাগার ঘটনায় বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিল্টন দত্ত বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪৩৬/৩০৪(ক)/৪২৭/১০৯ ধারায় মামলা করেন। এজাহারে এস এম এইচ আই ফারুক, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ও তাসভীরুল ইসলামকে আসামি করা হয়। এদিকে, এফআর টাওয়ারের ভুয়া নকশা তৈরির অভিযোগে ভবন মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুলসহ ৪ জনের বিচার চলছে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। মামলার অপর আসামিরা হলের, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ূন খাদেম, রূপায়ন গ্রুপের কর্ণধার লিয়াকত আলী খান মুকুল ও রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান। নকশা জালিয়াতির মামলায় রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারের ভবন মালিক সৈয়দ মো. হোসাইন ইমাম ফারুকসহ (এস এম এইচ আই ফারুক) ১৬ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ। এ মামলায় মো. মোফাজ্জেল হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল বাকীকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই মামলার অপর আসামিরা হলেন, অপর আসামিরা হলেন- রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, এফআর টাওয়ার ওনার্স সোসাইটির সভাপতি কাসেম ড্রাইসেলের এমডি তাসভীর-উল- ইসলাম, রাজউকের সাবেক পরিচালক মো. শামসুল আলম, সহকারী পরিচালক শাহ মো. সদরুল আলম, সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক জাহানারা বেগম, সহকারী পরিচালক মেহেদউজ্জামান, রাজউকের উচ্চমান সহকারী মো. সাইফুল আলম, ইমারত পরিদর্শক (নকশা জমা গ্রহণকারী) ইমরুল কবির, ইমারত পরিদর্শক মো. শওকত আলী, উচ্চমান সহকারী মো. শফিউল্লাহ, সাবেক অথরাইজড অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম , নিম্নমান সহকারী মুহাম্মদ মজিবুর রহমান মোল্লা, অফিস সহকারী মো. এনামুল হক ও শওকত আলী। বর্তমানে এই মামলাটিও সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
Published on: 2024-03-28 07:07:37.5421 +0100 CET

------------ Previous News ------------