বাংলা ট্রিবিউন
সুন্দরবনে স্মার্ট টহল: কমেছে অপরাধ, গ্রেফতার ২৮১৯

সুন্দরবনে স্মার্ট টহল: কমেছে অপরাধ, গ্রেফতার ২৮১৯

ডিজিটাল মনিটরিংয়ের (নজরদারি) আওতায় রয়েছে সুন্দরবন। এর মাধ্যমে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্মার্ট টহল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে ড্রোন দিয়ে চলছে মনিটরিং কার্যক্রম। এতে গত ছয় বছরে সুন্দরবন থেকে দুই হাজার ৮১৯ শিকারি ও অপরাধীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের কাছ থেকে এক হাজার ৩২৫ নৌযান, মাছ ও প্রাণী শিকারের নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। *স্মার্ট টহল কী?* সুন্দরবন বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেও বনরক্ষী এবং নৌকাচালক নৌকাযোগে সুন্দরবনে টহল দিতেন। তখন টহল পরিমাপ পদ্ধতি, তথ্য সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সীমাবদ্ধতা ছিল। বর্তমানে স্মার্ট টহল পরিচালিত হচ্ছে। ৮-১০ জনের টহল দল গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে বুকে গো-প্রো ক্যামেরা বেঁধে এবং বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরে জলে-স্থলে টহল দিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে থাকছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, জেনারেটর, ১২-১৪ দিনের খাবার ও ওষুধ, দ্রুতগামী জলযান, লগ বই এবং জিপিএস রিসিভার। তারা সহজেই বন্যপ্রাণী, এদের প্রতি হুমকিসমূহ ও অপরাধীকে শনাক্ত করেন। সেইসঙ্গে মালামাল আটক ও অপরাধীদের গ্রেফতার করছেন। পরবর্তী দিনের টহল পরিচালনার দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। টহল শেষে তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন তৈরি করেন। বন্যপ্রাণী ও এদের আবাসস্থল, অপরাধ-অপরাধী, বন্যপ্রাণী শিকারি, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা, বনজসম্পদ আহরণের স্থানগুলোর বিষয়ে ডাটাবেজ তৈরি করছেন। এর ফলে আগামী দিনে লগ বইয়ের প্রয়োজন পড়বে না। লগ বই ও জিপিএস রিসিভারের স্থান দখল করেছে সাইবার ট্র্যাকার। সাইবার ট্র্যাকার হলো একটি মোবাইল এপ্লিকেশন। যা জিপিএস সুবিধাসম্পন্ন যেকোনো স্মার্ট মোবাইল ফোনে ইনস্টল করে টহল কার্যক্রম চালানো যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইউএসএআইডির অর্থায়নে বাঘ প্রকল্পের সহযোগিতায় ২০১৫ সালের জুন মাস থেকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের পশ্চিম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে স্মার্ট টহল শুরু হয়। স্ট্রেনদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন প্রকল্পের অর্থায়নে ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে সুন্দরবনের অন্যান্য রেঞ্জে স্মার্ট টহল সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, অননুমোদিত জাল ব্যবহার, কাঁকড়া ধরা, বন্যপ্রাণী শিকার এবং শিকার নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরা রোধ সম্ভব হয়েছে। সেইসঙ্গে বন্যপ্রাণী হত্যা ও অপরাধ কমেছে। *স্মার্ট টহলের পদ্ধতি* প্রতি রেঞ্জে নিয়মিত দুটি দল মাসে দুবার পর্যায়ক্রমে টহল দেয়। প্রত্যেক দল ১২-১৪ দিন এবং প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা টহল দেয়। সংরক্ষিত এলাকার প্রবেশযোগ্য সব স্থানে জলযানে ও পায়ে হেঁটে কার্যক্রম চালানো হয়। অপরাধপূর্ণ এলাকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের সঙ্গে হ্যান্ডবুক, লগ বই, মানচিত্র, জরুরি যোগাযোগ নম্বর, সাইবার ট্র্যাকার, জিপিএস, খাবার ও ওষুধ, মোবাইল, ভিএইচএফ রেডিও এবং ওয়াকিটকিসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকে। টহলের সময় বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ এবং বনে অপরাধ অনুসন্ধান করা হয়। অপরাধের প্রমাণ, আলামত সংগ্রহ, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি এবং গ্রেফতার করা হয়। স্মার্ট টহলের কারণে সুন্দরবনে অপরাধ, বন্যপ্রাণী এবং হরিণ হত্যা কমেছে বলে উল্লেখ করেছেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আমাদের সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নদী ও খাল নজরদারিতে ড্রোন ব্যবহার হয়। এর সফলতাও পাওয়া গেছে। স্মার্ট টহল ব্যবস্থা আগের চেয়েও জোরদার করা হয়েছে। এসব কাজে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে অপরাধীর সন্ধানদাতার পরিচয় গোপন রাখা হয়। এমন ২৮টি ঘটনায় এক লাখ ৯৬ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্মার্ট টহলের আওতায় দুই হাজার ৮১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সেইসঙ্গে বিপুল পরিমাণ নৌযান, মাছ ও প্রাণী শিকারের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।’ *মাছ শিকারের ঘটনা কমেছে* সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ঘটনা এখন আর তেমন ঘটছে না বলে জানালেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনার মৎস্য বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হলো মানুষ ও ধরিত্রীর বন্ধন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ডিজিটাল উদ্ভাবন। এই প্রতিপাদ্য অনেক আগে থেকেই সুন্দরবন এলাকায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর আওতায় ড্রোন দিয়ে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। স্মার্ট টহল চলছে। যার ফলে সুন্দরবনের গহীনের খালে নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।’ এদিকে, রবিবার (৩ মার্চ) বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস উপলক্ষে মোংলায় ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, সুন্দরবন রক্ষায় আমরা ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপার’-এর আয়োজনে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য দমনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো বন্যপ্রাণী অপরাধীদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় জটিলতা। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ ঘটনায় আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ কম ঘটনায় মামলা হয়েছে। অনেকে গ্রেফতার হয়নি।
Published on: 2024-03-04 03:03:31.809359 +0100 CET

------------ Previous News ------------