বাংলা ট্রিবিউন
‘অভুক্ত’ শিশুর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে কেন এত বেশি?

‘অভুক্ত’ শিশুর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে কেন এত বেশি?

সামাজিক উন্নয়নের অনেকগুলো সূচকে কিংবা ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ যে তার প্রতিবেশী ভারতকে অনেকগুলো ক্ষেত্রেই পেছনে ফেলেছে এটা কোনও নতুন খবর নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে— ‘জিরো ফুড চিলড্রেন’ বা চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোনও খাবার খেতে পায়নি এমন শিশুর সংখ্যাতেও ভারতের পরিসংখ্যান খুবই লজ্জাজনক, এবং বাংলাদেশ এখানেও ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। গবেষণাটি সম্পাদিত হয়েছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পপুলেশন হেলথ বিভাগের অধ্যাপক এস ভি সুব্রমানিয়ানের নেতৃত্বে। আরও দু’জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আমেরিকার ডিউকস ইউনিভার্সিটির ওমার কার্লসন ও দক্ষিণ কোরিয়ার রকলি কিম এই কাজে তাকে সহায়তা করেছেন। তাদের এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’ নামে একটি সুপিরিচিত জার্নালে। ** এই গবেষণার বিষয়বস্তুতে যাওয়ার আগে প্রথমেই অবশ্য বুঝে নেওয়া দরকার ‘জিরো ফুড চিলড্রেন’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে। এই গবেষকরা জানাচ্ছেন, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশু তার প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পৌষ্টিক উপাদানগুলো মায়ের দুধ থেকেই পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু ছয় মাসের পর থেকে মায়ের দুধ তার সব প্রয়োজন মেটাতে পারে না– তখন তার দরকার পড়ে বাইরের খাবার। এখন যদি কোনও জরিপ করার সময় দেখা যায়, একটি ছয় মাস থেকে চব্বিশ মাস বয়সের মধ্যেকার শিশু তার আগের চব্বিশ ঘন্টায় মায়ের দুধ, ফর্মুলা দুধ, সলিড বা সেমি-সলিড কোনও ধরনের খাবারই খেতে পায়নি, তাহলে তাকে বলে ‘জিরো ফুড চিলড্রেন’। ** এখন ‘জিরো ফুড চিলড্রেন’-দের নিয়ে এই গবেষণাটি চালানো হয়েছে বিশ্বের মোট ৯২টি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে। এর মধ্যে দেখা গেছে ‘জিরো ফুড চিলড্রেনে’র শতকরা হার সবচেয়ে বেশি পশ্চিম আফ্রিকার দুটো দেশ গিনি (২১.৮%) আর মালিতে (২০.৫%)। এরপর তৃতীয় স্থানেই আছে ভারত, যেখানে এই শতকরা হার হলো ১৯.৩%। অথচ সেই একই গবেষণা জানাচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিরো ফুড চিলড্রেনের শতকরা হার মাত্র ৫.৬%। এর অর্থ, প্রতি এক হাজারে বাংলাদেশে যেখানে ৫৬টি শিশু অভুক্ত থাকছে সেখানে ভারতে প্রতি হাজারে সেই সংখ্যাটাই ১৯৩ অর্থাৎ প্রায় চার গুণ বেশি। প্রসঙ্গত, এখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের এবং ভারতের ক্ষেত্রে ২০১৯-২১ সালের সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে। পাকিস্তানও এখানে ভারতের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে, যদিও তাদের রেকর্ড বাংলাদেশের তুলনায় বেশ খারাপ। ওই রিপোর্টটি বলছে, পাকিস্তানে ‘জিরো ফুড চিলড্রেনে’র শতকরা হার ৯.২%। এটা আবশ্য সে দেশের ২০১৭-১৮ সালের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে। ** বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের জনসংখ্যা যেহেতু অনেক বেশি, তাই মোট ‘জিরো ফুড চিলড্রেনে’র সংখ্যাতেও ভারত যথারীতি অনেক অনেক এগিয়ে। ভারতে যেখানে এই ধরনের অভুক্ত শিশুর মোট সংখ্যা ৬৭ লাখেরও বেশি, বাংলাদেশে সেখানে সংখ্যাটা মাত্র আড়াই লাখের মতো। দক্ষিণ এশিয়াতে এখানে সবচেয়ে ভালো রেকর্ড মালদ্বীপের, তার পরেই রয়েছে নেপাল। আবার ভারতের চেয়ে ভালো রেকর্ড রয়েছে এমন কী আফগানিস্তানেরও, যদিও সেখানে প্রায় নয় বছরের পুরনো (২০১৫ সালের) পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে। গোটা দুনিয়ার দিকে তাকালে পশ্চিম আফ্রিকাতেই যে এই সঙ্কট সবচেয়ে বেশি, তা নিয়ে অবশ্য কোনও সন্দেহ নেই। গিনি, মালি, বেনিন বা লাইবেরিয়ার মতো দেশগুলোতে এত বেশি সংখ্যায় অভুক্ত শিশুর তবু একটা কারণ বোঝা যায়– কিন্তু ভারতের মতো উদীয়মান ও শক্তিশালী একটি অর্থনীতিতেও ‘জিরো ফুড চিলড্রেনে’র আনুপাতিক সংখ্যা প্রায় একই রকম, এটা অনেকের কাছেই বেশ দুর্বোধ্য। বস্তুত ওই গবেষণাটি বলছে, মূলত ভারতের কারণেই সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এই জিরো ফুড চিলড্রেনের র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রায় পশ্চিম আফ্রিকার কাছাকাছি নেমে এসেছে। যদিও গোটা দক্ষিণ এশিয়াতে (মানে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান-নেপাল-শ্রীলঙ্কা সব মিলিয়ে) জিরো ফুড চিলড্রেনের মোট সংখ্যা ৮০ লাখের মতো বলে বলা হচ্ছে, যার মধ্যে ৬৭ লাখেরও বেশি শুধু ভারতেই। ** তবে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গবেষণাটিতে বলা হয়েছে সব সময় যে খাবারের অভাবেই এই শিশুরা অভুক্ত থাকছে তা কিন্তু নয়। বরং অনেক সময় শিশুর মা-বাবার পরিস্থিতি এমন দাঁড়াচ্ছে যে তারা বাচ্চাকে খাওয়ানোর মতো সময় বা সুযোগ পাচ্ছেন না– যে কারণে বাচ্চাটি অনেক সময় কিছু না-খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ছে। দিল্লিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিশু চিকিৎসক বন্দনা প্রসাদ (এই গবেষণার সঙ্গে তিনি যুক্ত নন) এ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘ছ’মাস বয়সী একটা শিশুকে ঠিকমতো খাওয়ানো কিন্তু মোটেই সহজ কাজ নয়। এতে অনেক সময় আরও এনার্জি লাগে।’ ‘কিন্তু আমাদের দেশে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এমন যে হয় মা-কে কাজে বেরোতে হচ্ছে, কিংবা বাড়িতেও এত কাজের চাপে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন যে বাচ্চাকে খাওয়ানোর কোনও ফুরসতই পাচ্ছেন না, কিংবা কাহিল হয়ে পড়ছেন। ভারতে এত বেশি সংখ্যায় ‘জিরো ফুড চিলড্রেনে’র এটা একটা বড় কারণ বলে আমার ধারণা’, বলছিলেন বন্দনা প্রসাদ। বাংলাদেশেও অবশ্যই দারিদ্র আছে, কিন্তু সেখানে মায়েরা যে কোনোভাবেই হোক তাদের ছ’মাস থেকে দু’বছর বয়সী শিশুদের যে মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন– এবং সেটা ভারতের তুলনায় অনেক বেশি ভালোভাবে– তা এই গবেষণা থেকে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
Published on: 2024-03-06 18:17:24.232835 +0100 CET

------------ Previous News ------------