বাংলা ট্রিবিউন
২৫ বছরেও শনাক্ত হয়নি উদীচী হত্যাযজ্ঞের অপরাধী

২৫ বছরেও শনাক্ত হয়নি উদীচী হত্যাযজ্ঞের অপরাধী

বহুল আলোচিত যশোরে আড়াই দশক আগে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘাতকরা আজও শনাক্ত হলো না। দীর্ঘ ২৫ বছরেও দেশের প্রথম জঙ্গি হামলার এই ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। মামলাটি পুনরায় চালুর জন্য উচ্চ আদালতের একটি আদেশের জন্য দেড় যুগ ধরে অপেক্ষা করছেন ওই ঘটনায় আহত ও নিহতদের পরিবারসহ যশোরবাসী। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিচার না পেয়ে হতাশ ক্ষতিগ্রস্ত ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। গত ১৪ বছর ধরে উচ্চ আদালতে আপিল শুনানিতে ঝুলে আছে মামলার বিচারিক কার্যক্রম। শুনানি শেষে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম কবে শুরু হবে তা জানে না কেউ। যদিও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রতি বছরই বলছেন, তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন মামলাটির কার্যক্রম শুরু করার। এমনই পরিস্থিতিতে বুধবার (০৬ মার্চ) নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের ২৫তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। সরকারি কৌঁসুলির দাবি, এই মামলার আপিল শুনানির জন্য তদবির প্রয়োজন। শুনানি সম্পন্ন হলে মামলাটি গতি পাবে এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে। মার্চ মাস এলেই প্রিয় ভাইয়ের স্মৃতিতে তৈরি এই স্তম্ভে এসে সময় কাটান বিউটি আক্তার। অজান্তে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বেদনার অশ্রু। একবুক হতাশা নিয়ে বিলাপ করেন। এ বেদনা যতখানি না ভাই হারানোর, তার থেকে বেশি ২৫ বছরেও বিচার না পাওয়ার। তবে এখনও আশা রাখেন ন্যায়বিচারের। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ রাতে যশোরে এ টাউন হল মাঠে উদীচীর দ্বাদশ মহাসম্মেলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত হয়েছিলেন বিউটি আক্তারের ছোট ভাই তপনসহ ১০ সাংস্কৃতিক কর্মী। অঙ্গহানি ঘটে সুকান্ত, নাহিদসহ কয়েকজনের। আর বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। যার দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। কিন্তু দুর্বল তদন্তের কারণে বিভীষিকাময় ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০০৬ সালের ৩০ মে খালাস পেয়ে যায় সব আসামি। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে উদীচী ও ২০১১ সালে সরকার হাইকোর্টে আপিল করলে তা গৃহীত হয়। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৭ আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। মামলাটি পুনরায় চালুর জন্য উচ্চ আদালতের একটি শুনানি ও আদেশের প্রয়োজন। কিন্তু দেড় যুগ ধরে সেই শুনানি হয়ে ওঠেনি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিচার না পেয়ে হতাশ ক্ষতিগ্রস্ত ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রযন্ত্রের অবহেলার কারণেই বিচার পাচ্ছেন না তারা। উদীচী হামলায় নিহত তপনের বড় বোন নাজমুন সুলতানা বিউটি বলেন, ‘আজ ২৫ বছর হয়েছে ভাইকে হারিয়েছি। সারা বছরই কষ্ট। কিন্তু মার্চ মাস এলেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। আমার মা শয্যাশায়ী। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও এই হত্যার বিচার দেখতে চাই। প্রত্যেক বছর সাংবাদিকরা এই বিষয়টা সামনে নিয়ে আসে। সবাই এই বিচারের আশায় আছে। কিন্তু জেগে ঘুমায় থাকলে সেই ঘুম ভাঙানো যায় না। আমরা চাই, ভাই হত্যার বিচার হোক। রাষ্ট্রের কাছে এই একটাই আবেদন।’ বোমা হামলায় পা হারানো সুকান্ত দাস বলেন, ‘দীর্ঘ ২৫ বছর হয়ে গেলো অথচ এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার হলো না। এটা বলতেও এখন লজ্জা লাগে। ১৯৯৯ সালে যখন ঘটনা ঘটেছিল তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। ২০০৮ সাল থেকে চার টার্ম এই সরকার ক্ষমতায়। তারপরও এই ঘটনার বিচার হলো না, কী বলবো? নিজেদের কাছে আশ্চর্য মনে হয়। এই সরকার দাবি করে তারা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি, সাংস্কৃতিবান্ধব, সব কিছুই তারা দাবি করে। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির ওপরে সবচেয়ে বড় যে হামলাটা হলো তার বিচার এখনও হলো না। গত ২০/২৫ বছরে বাংলাদেশে বহু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। উদীচীর মতো একটা বড় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেটা জাতীয় পর্যায়ের, এর বিচার না হওয়ায় সরকারের দায় আছে। রাষ্ট্র যদি চায় এখনই এর বিচার সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘উদীচীর ঘটনায় পা হারিয়ে নানাবিধ কষ্টের মধ্যে আছি। এর মধ্যে বড় ব্যথা বিচার না পাওয়া। ন্যায়বিচারটা পেলে দোষীদের দণ্ডিত হতে দেখতে পারলে সব কষ্ট ম্লান হয়ে যেত।’ উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, ‘কষ্টের কথা হলো ২৫ বছর ধরে আমাদের বিচার চাইতে হচ্ছে। ২০০৬ সালে এই মামলার প্রথম রায়ে সকল আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। সেখানে বিচারক দুর্বল তদন্তের বিষয়টি উল্লেখ করেন। ন্যায়বিচার পেতে আমরা আপিল ও পুনরায় তদন্তের আবেদন করি। সেটাও ১৮ বছর হয়ে গেছে। দীর্ঘ এই সময়েও একটা তদন্ত পেলাম না। বর্তমান প্রজন্ম উদীচী ট্র্যাজেডির কথা জানেই না। ফলে এর বিচার নিয়ে আমাদের মধ্যে সংশয় রয়েই গেছে। তবে আমরা চাই এই সরকার একটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যক্কারজনক এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক।’ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি কলঙ্কিত দিন ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ। এদিন যশোর টাউন হল ময়দানে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে বর্বর বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। আজকে দুই যুগ পার হয়ে গেলো, এখনও পর্যন্ত আমরা এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার পেলাম না। প্রকৃত দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হলো না। রাজনীতিকরণের মধ্য দিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করে এর মধ্য দিয়ে প্রকৃত যারা দোষী, তারা পার পেয়ে গেলো। এটা আমাদের জন্য, জাতির জন্য একটি দুঃখজনক এবং কলঙ্কজনক বিষয়। ইতিহাস এ বিষয়টিকে কখনও ক্ষমা করবে না। একজন সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে আমরা বিস্মিত, দুঃখিত যে আজকে দুই যুগ পরেও সেই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার পেলাম না। আজকে দুই যুগ পরে আমরা বিচার পাবো কি পাবো না—এটা নিয়ে যে সংশয় ও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে আজকের এই প্রেক্ষাপটে আমরা বলি যে, বিচার পাই না তাই আর বিচার চাই না। সেই রকম একটা অবস্থানের জায়গায় আমাদের সেন্টিমেন্ট চলে গেছে। তারপরও সরকার চাইলে যেকোনও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে পারে। এদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ইদ্রিস আলীর দাবি, এ মামলার আপিল শুনানির জন্য তদবির প্রয়োজন। শুনানি সম্পন্ন হলে মামলাটি গতি পাবে এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে। দিবসটি উপলক্ষে বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, বিকালে প্রতিবাদী মৌন মিছিল, আলোচনা সভা, শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মশাল প্রজ্বলন এবং প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে উদীচী যশোর।
Published on: 2024-03-06 04:40:45.758862 +0100 CET

------------ Previous News ------------