বাংলা ট্রিবিউন
‘নারী দিবসে কি টাকা পাওয়া যায়?’

‘নারী দিবসে কি টাকা পাওয়া যায়?’

মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের প্রধান সড়কের পাশে ভাঙাচোরা অস্থায়ী একটি চা দোকান নিয়ে বসে আছেন রাহেলা। দুটি বয়ামে কয়েকটি বিস্কুট, ঝুলন্ত ব্যাগে পাউরুটি-কেক ও চা ছাড়া ক্রেতা আকৃষ্ট করার মতো তেমন পণ্য নেই দোকানে। তবু কেউ এসে চায়ের অর্ডার দিলে আনন্দে চকচক করে ওঠে তার মুখচ্ছবি। যা আছে তার মধ্যেই সেবা দিতে কার্পণ্য করতে চান না। সকাল ৭টা থেকে বসে আছেন রাহেলা। বেলা ২টা পর্যন্ত বিকিকিনি করেছেন ১০০ টাকার মতো। সকাল থেকে কয়েকজন মাত্র ক্রেতা চা-বিস্কুট খেতে এসেছেন। কিন্তু দৈনিক খরচের ভার মাথায় নিয়ে আরও আয়ের আশায় চাতক পাখির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা চারপাশে তার দৃষ্টি থাকে নিবদ্ধ। বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ) নবোদয় হাউজিং সোসাইটি এলাকায় কথা হয় রাহেলার সঙ্গে। বয়স ঠিকঠাক বলতে পারছেন না। তবে ধারণা করে বললেন ৬৫ কি ৭০ হবে। চা বেছেই সংসার চলে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চলে, কোনও বেলা খেয়ে থাকি, কোনও বেলা না খেয়ে।’ নবোদয় হাউজিংয়ের রাস্তার মাথার একটি বস্তিতে থাকেন রাহেলা। পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া দেন। এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে চার জনের সংসার। স্বামী মারা গেছেন ৯ বছর আগে। ২০ বছর বয়সী ছেলেও বেকার। ছোট্ট দোকানের আয় দিয়েই চলে তার পুরো সংসার। চারদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে রাহেলারও নাভিশ্বাস উঠেছে। তাই হিমশিম সংসারে দুই মাসের বাড়ি ভাড়া এখনও দিতে পারেননি। এ জন্য প্রতিদিনই রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানে থাকতে হয় তাকে। কিন্তু কোনও দিন ২০০ টাকা আবার কোনও দিন ৩০০ টাকা আয় নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। আজ দুপুরের খাবারের আয়োজন কী? জানতে চাইলে বলেননি রাহেলা। শুধু বলেন, ‘স্বামী মারা গেছে। আজও বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা পাইনি। চা বেচে সংসার চালাতে পারি না। বাসা ভাড়া তাড়াতাড়ি না দিলে বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে। আগামীকাল ৮ মার্চ (শুক্রবার) ‘নারী দিবস’ জানেন কি? এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে রাহেলা বলেন, ‘নারী দিবসে কি টাকা পাওয়া যায়?’ শুধু রাহেলা নন, এমন প্রশ্ন ঝুমা (২৫), শিপা (২৬), হালিমা (৩৫), বিজলীরও (৫৫)। হালিমা, বিজলী সবজি বিক্রি করেন, ঝুমা করেন শাক বিক্রি, আর শিপা পাকা কলা বিক্রি করে সংসার খরচ বহন করেন। সামান্য এই আয়ের ওপর নির্ভর করছে তাদের গোটা সংসার। নিম্নবিত্ত ও পরিশ্রমী এসব নারীর সঙ্গে কথা বললে তাদের জীবনের গল্প উঠে আসে লড়াই-সংগ্রামের কাব্য। তবে তারা জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন এত সব খোঁজ নিচ্ছেন?’ নারী দিবস বলতেই তারা জানেন না এ দিবস কী। এ দিবসে কী হয় তাদের নিয়ে? টাকা দেয়? ৫৫ বছর বয়সী বিজলী সবজি বিক্রি করে স্বামীর চিকিৎসা ও সংসার খরচ চালান। কানে কম শোনা বিজলী বলেন, ‘কেউ টাকা দেয় না। স্বামী বিছানায় পড়ে আছে, চালান নেই, তাই বেচাকেনা ভালো নয়। দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। এই দিয়েই সংসার চলে কোনো রকমে।’ তিন মেয়েসহ চার জনের সংসার এভাবে চালানো গেলেও ভবিষ্যতে মেয়েদের কী হবে, তা নিয়ে হতাশ বিজলী বলেন, ‘নারী দিবসে কি সরকার টাকাপয়সা দেবে? যদি দেয় তাহলে আমার নামটা লিখে নেন।’ শাকসবজি বেচে সংসার আগলে রেখেছেন ঝুমা, শিপা ও হালিমা। তাদের সংসার কোনোমতে চললেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য হারিয়েছেন তারা। কেউ কেউ ছেলেকে স্কুলে দিলেও মেয়েকে স্কুলে দিতে পারেননি। আবার অনেকের পক্ষে সম্ভবই হচ্ছে না। এদিকে ঝুমার স্বামী সন্তানকে নিয়েও শাক বিক্রি করেন। তাদের আয় অন্যদের চেয়ে একটু বেশি হওয়ায় ১০ বছর বয়সী ছেলেকে লেখাপড়া করাতে এবার স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন তিনি। শিপা ভাঙাচোরা একটি ভ্যানে পাকা কলা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়েও কলা বেচতে আসতে হয় তাকে। সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কলা বিক্রি করেন। আয় হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। তারা সবাই জানান, জীবনে লড়াই করেই চলতে হয় আমাদের মতো গরিব নারীদের। তার ওপর বাজারের জিনিসপত্রের দামে কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সামান্য আয় দিয়ে ঘরভাড়া দেবো? নাকি সংসার চালাবো? নাকি ছেলেমেয়েকে মানুষ করবো—কিছুই জানি না। আমাদের দিকে নজর দেওয়ার সরকারের সময় কই?
Published on: 2024-03-08 03:02:11.134235 +0100 CET

------------ Previous News ------------