বাংলা ট্রিবিউন
সমাজে পুরুষের ওপর চাপ বাড়ছে

সমাজে পুরুষের ওপর চাপ বাড়ছে

আমার স্ত্রী চাকরি করেন। ৯টা ৫টা অফিস সময়ের বাইরেও তার নানাবিধ যুক্ততা রয়েছে। ঘরের বেশিরভাগ কাজ আমি সামলে নিতে চেষ্টা করি। তার বাইরের কাজ বেশি হওয়ায় ঘরে ফিরলে তাকে এক কাপ চা এগিয়ে দিলে— আমার মা-বোনের কটূ কথা শুনতে হয়। বন্ধুদের আড্ডায় সময় দিতে না পারলে বউকে টেনে নানা কথা শুনতে হয়। আমি দেখেছি, আমার বন্ধুরা নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে, রাত করে ঘরে ফিরছে। ঘরের কাজে স্ত্রীকে সামান্য সময়ও দিচ্ছে না। যার ফলে আমি কেন দিচ্ছি— সেই প্রশ্ন তুলে হাসাহাসি করে থাকে। কথাগুলো বলছিলেন ঘরে বসে কনসালটেন্সির কাজ করা রাহাত। রাহাতের ঠিক উল্টো সাফায়েত বলছেন, আমার স্ত্রী বাইরে কাজ করে না। বিয়ের আগে থেকেই আমি বাসার সব খরচ চালাই। বেসরকারি চাকরি, আজ আছে কাল নেই। বেতন অনিয়মিত হয় মাঝেসাঝে। এসব আমি কাউকে বলতে পারি না। বহুদিন ধরে বাবা-মা, এক ভাই, স্ত্রী, এক কন্যার দায়িত্ব পালন করতে করতে ক্লান্ত হলেও এ সমাজ বলে দিয়েছে—  এটা আমাকে পারতেই হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন পুরুষ পরিবারের সবার জন্য অর্থ উপার্জন করবে, সবার দায়িত্ব বহন করবে, সবার জন্য সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তার স্ত্রীর সুবিধার কথা আলাদা করে ভাববেন না। স্ত্রী বেশি বেতনের চাকরি করলে তারও বেতন বেশি এমন চাকরি খুঁজতে হবে, স্ত্রী বসে টিভি দেখলে রান্নাঘরের বাসন পুরুষ হিসেবে তিনি ধুয়ে ফেলতে পারবেন না, এমন হাজারো রোল তাকে শেখানো হয়। নারীর জায়গায় থেকে সংবেদনশীলভাবে যদি সে অ্যাক্ট করে, তাহলে সমাজ তাকে ‘পুরুষ’ গণ্য করে না। নারীর জায়গা থেকে দেখার কারণে কী ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয় প্রশ্নে উন্নয়নকর্মী জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘অনেকে অভিযোগ করেন— আমি মানুষকে শাস্ত্রীয় বিধানের বাইরে যেতে উৎসাহিত করছি। আমাদের মতো নারীবাদীর কারণে মেয়েরা বেঁধে দেওয়া সীমানাকে প্রশ্ন করতে শুরু করছে, যাতে তাদের (পুরুষ) ক্ষতি হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও আপত্তি উঠেছে। যেমন, এক মামাতো বোনের বাল্যবিয়ে বন্ধ করায়, তাদের কাছে আমাকে ভিলেন হয়ে দাঁড়াতে হয়েছে। অভিযোগ ছিল, ঘরোয়া শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। গত ‘মা দিবসে’ নারী হয়ে জন্মাতে না পারার কারণে এই মানবজন্মে কিছু অনিবার্য অপ্রাপ্তির বিষয়ে লিখেছিলাম। তাতে ভীষণ রকম ট্রলের শিকার হয়েছি।’’ সভ্যতার এই পর্যায়ে এসে, যখন পৃথিবীতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে পাঁচ জনের বেশি নারী ও কন্যাশিশু তাদের পরিবারের কারও হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে, যখন প্রতি তিন জন নারীর একজন জীবনে অন্তত একবার হলেও যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যখন শতকরা ৮৬ ভাগ নারী ও কন্যাশিশু জেন্ডার সহিংসতায় কোনও বিচারিক প্রতিকার পাচ্ছে না, তখন আমাদের সবারই— মানববাদী হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, নারীবাদী হয়ে ওঠা কর্তব্য। সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বের কথা বাদ দিলেও ব্যক্তিগত শান্তি ও তৃপ্তির জন্যে সামাজিক চাপ সত্ত্বেও সবার নারীবাদী হয়ে ওঠা দরকার। পুরুষতন্ত্রের শিকার পুরুষও উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ের আত্মহত্যার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— সমাজের নির্ধারণ করে দেওয়া রোলগুলো পালন করতে না পারার কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। যে পুরুষরা সমতার বিষয়ে কথা বলে, যে পুরুষ পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে কথা বলে— তারা স্বভাবতই সেই প্রতিষ্ঠিত সমাজের চাপে থাকে। তিনি ফেমিনিন মেল, ফেমিনিস্ট মেল-এর যে চাপ সেটিকে উল্লেখ করে বলেন, ‘নারীবাদী পুরুষ, বা যে পুরুষ মেয়েলি ঢঙে কথা বলছেন— এ দুটোই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পছন্দ করে না। এর সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক যে ক্ষমতার চর্চা সেটা জড়িত। এ তিনটি কাটাতে না পারলে পুরুষরাও মানবিক হতে পারবেন না। পুরুষতন্ত্র পুরুষকে যেভাবে দেখতে চায়, তার বিরুদ্ধে গেলে পুরুষরা সমাজের তৈরি করা চাপে পড়তে বাধ্য।’
Published on: 2024-03-08 07:08:14.631896 +0100 CET

------------ Previous News ------------