বাংলা ট্রিবিউন
জাপানি শিশুদের অভিভাবকত্ব: আদালতের বাইরে চলছে ‘লড়াই’

জাপানি শিশুদের অভিভাবকত্ব: আদালতের বাইরে চলছে ‘লড়াই’

জাপানি মা নাকানো এরিকো আর বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফের তিন শিশু কার কাছে থাকবে— সে বিষয়টি সুরাহা করে দিয়েছে বাংলাদেশের আদালত। কিন্তু সমাধান হয়েও হয়নি। আদালতের শেষ রায়ের পর থেকে ফেসবুকজুড়ে লাইলা ও তার বাবার বেশকিছু কনটেন্ট নিয়ে তৈরি হয়েছে সমালোচনার ঝড়। আবার যে মেয়েটিকে মায়ের জিম্মায় দিয়েছেন আদালত, তাকে বাবার দেখার বিষয়ে মায়ের আপত্তিজনিত ভিডিও’র প্রমাণ মিলেছে। বাবার ভিডিওতে মাকে উদ্দেশ করে ইমোশনাল কথা বলার পাশাপাশি মাকে দোষারোপ করে নানা বক্তব্য দিতে দেখা গেছে লাইলাকে। আবার মায়ের হেফাজতে থাকা বড় মেয়েকে রাস্তায় পেয়েও কথা বলতে না পারার আকুতি আছে বাবার। বাবা ও মায়ের এই রোষানলের শিকার হচ্ছে তাদের শিশু সন্তানরা। ইমরান শরীফের আইনজীবীরা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে না দেখলেও জাপানি মায়ের পক্ষের আইনজীবী বলছেন— এটা শিশুর নিরাপত্তা ও সম্মানের ক্ষেত্রে হানিকর। তারা আগামী সোমবার (১১ মার্চ) আদালতের শুনানিতে বিষয়গুলো আবারও তুলবেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মামনুন রহমানের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ ঠিক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রথম ও তৃতীয় মেয়েকে নিয়ে জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো বাংলাদেশে বা যেকোনও দেশে বসবাস করতে পারবেন। তবে বাবা তার সন্তানদের (মায়ের জিম্মায় থাকা দুই মেয়ে) সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাবেন। একইভাবে দ্বিতীয় মেয়ে লাইলা লিনা বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফের কাছে থাকবেন। সেক্ষেত্রেও জাপানি মা তার দ্বিতীয় মেয়ের (লাইলা) সঙ্গে দেখার সুযোগ পাবেন। আগামী সোমবার (১১ মার্চ) এ বিষয়ে আবারও শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ঢাকার জেলা জজ আদালত বাংলাদেশে থাকা জাপানি দুই শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা জাপানি মায়ের কাছে থাকবে বলে রায় দেন। পরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন ইমরান শরীফ। ইমরান শরীফের ফেসবুকের ভিডিওতে দেখা যায়— লাইলা তার মাকে উদ্দেশ করে বলছে ‘তুমি কখনও সমাধানের চেষ্টা করোনি’। ‘নিজের স্বার্থ দেখছো’। ‘তুমি বাচ্চাদের স্বার্থে কিছু করছো না।’ ‘হেফাজতের মামলা বাচ্চাদের স্বার্থে হওয়া উচিত’,-সহ আরও অনেককিছু। ইমরান শরীফ পোস্ট করেছেন, জাপানি মায়ের সঙ্গে ঢাকাতেই অতীতে লাইলার কী ভীষণ বেদনাদায়ক সময় গেছে…। তারপর সে (লাইলা) কোনোরকমে মায়ের কাছ থেকে সরে গিয়ে বাবার কাছে আশ্রয় নেয়। এমনকি যে মেয়েটি মায়ের কাছে আছে, তাকে রাস্তায় পেয়ে বাবা কথা বলতে চাইলে, মা তাকে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। বা লাইলা যখন মায়ের কাছে ছিল, তখন বাবার দেওয়া খাবার গাড়িতে বসে খাওয়ার সময়— মা জোর করে খাবার কেড়ে নিয়ে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাক্ষীও আছে। আদালতে ইমরান শরীফের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার আখতার ইমাম, রাশনা ইমাম ও অ্যাডভোকেট নাসিমা আক্তার লাভলী। অপরদিকে নাকানো এরিকোর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। জাপানি মায়ের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনিরকে এসব ভিডিও’র বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি ১১/১২ বছরের মেয়েকে দিয়ে মায়ের বিষয়ে এসব বলানো খুব ‘ইনডিসিটেন্ট’। আমরা থামাতে চেয়েছি, পারিনি। যে বাবা-মায়েরা এরকম বিচ্ছিন্ন পরিবারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, তারাও সাংঘাতিকভাবে অস্বস্তিতে পড়ছেন। এভাবে মেয়েকে ব্যবহার করে তিনি (বাবা) একটা ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’ তৈরি করতে চাইছেন। প্রাইভেট বিষয় প্রাইভেটলি রাখতে হবে। বাচ্চা মেয়ে, সেতো সামাজিকভাবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার মুখ দিয়ে কথাগুলো বলাতে পারলে ভিউ ভালো হয়, সেটাতো ব্যবসাও। আমরা স্পষ্ট বলেছি, শিশুটিকে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।’’ তার (শিশির মনির) ক্লায়েন্ট জাপানি নাগরিক মেয়েদের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন কিনা প্রশ্নে বলেন, ‘না। জাপানিরা আইনের ব্যাপারে ভীষণ সচেতন এবং মা কখনোই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়ে আসবেন না। তিনি আইনজীবীর পরামর্শের বাইরে এখনও পর্যন্ত কিছু করেননি।’ ইমরান শরীফের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ‘শুধু বাবাই করছেন? মা কিছু করছেন না? আসলে ভিডিওগুলো আমার দেখা হয়নি। বাবা কী করছেন, বা মা কী করছেন কিছুই জানি না। আমি মামলা পরিচালনা করেছি মাত্র। মামলার পর দেখেছিলাম— মা তার সন্তানকে বারবার মিডিয়ার সামনে কথা বলার জন্য এগিয়ে দিচ্ছিলেন। আসলে তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার বিষয়টি দেখার কাজ আমার না। তবে আমি সেসব দেখলে হয়তো কিছু বলতে পারতাম— কে ঠিক করছেন বা করছেন না।’ এদিকে মেয়েকে দিয়ে এধরনের বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে মা বা তার আইনজীবীরা নিষেধ করেছেন কিনা প্রশ্নে ইমরান শরীফ টেলিফোনে বলেন, ‘গত তিন বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত আপলোড করছি। এটা অপ্রাসঙ্গিক আলাপ, আমি রাখছি।’ উল্লেখ্য, টোকিওভিত্তিক ৪৬ বছর বয়সী চিকিৎসক এরিকো ২০২১ সালের ১৮ জুলাই বাংলাদেশে আসেন এবং  ৫৮ বছর বয়সী ইমরান শরীফের ওপরে নির্দেশনা চেয়ে ১৯ জুলাই উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। পিটিশনে এরিকো বলেন, ২০০৮ সালের ১১ জুলাই তিনি ও ইমরান বিয়ে করেন। রিট পিটিশনে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২ শিশুকে জাপান থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন তাদের বাবা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন নাগরিক ইমরান শরীফ। এরিকো রিট পিটিশনে বলেন, ২০২১ সালের ১৮ জানুয়ারি ইমরান জাপানের একটি আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ জমা দেন। কিন্তু শুনানির জন্য নির্ধারিত তারিখে ওই আদালতে হাজির হননি ইমরান। এরিকোর আবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ২১ জানুয়ারি ইমরান টোকিও’র স্কুল থেকে মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তাদেরসহ বাংলাদেশে চলে আসেন।
Published on: 2024-03-09 20:41:33.969133 +0100 CET

------------ Previous News ------------