বাংলা ট্রিবিউন
ফেলে আসা রাস্তায় কেন ফিরতে হয়

ফেলে আসা রাস্তায় কেন ফিরতে হয়

মাত্র তিন দশকের মধ্যে একক পরিবার থেকে অবারও যৌথ পরিবারে ফেরার তাগিদ যেমন দেখা যাচ্ছে মানুষের মধ্যে, তেমনি গ্রামে ফেলে আসা পথ, একা রাখে আসা মা-বাবার কাছে নিজে ও সন্তানদের নিয়ে ফেরার প্রবণতাও তেমন বেড়েছে। সমাজ গবেষকরা বলছেন, ট্রানজিশনাল পিরিয়ড শেষ হতে না হতে আরেক ট্রানজিশন ঘটতে শুরু করেছে। নিজে ভালো থাকার জন্য নগরে ছুটে চলা মানুষ বুঝতে শুরু করেছে—সন্তানদের মধ্যে মানবিক গুণ গড়ে উঠবে না, যদি শিকড়ের কাছে তাদের ফেরানো না যায়। নিজেদের স্বার্থে যে প্রজন্ম ঘর ছেড়েছিল, নিজ স্বার্থেই সে আবার ঘরে ফেরে। ঈদের কদিন আগে থেকেই ঢাকা ছাড়তে থাকে মানুষ। মানুষের ঢাকায় আসার কারণের শেষ নেই। তবে মূল কারণটা কর্মসংস্থান। পেটের দায়ে বাধ্য হয়েই অধিকাংশ মানুষ ঢাকায় আবাস গড়েন। প্রতি বছর ঈদে লাখো মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের কর্মস্থল ছেড়ে বাড়িতে যান। ৭০ লাখের বেশি মানুষ থাকেন প্রবাসে; তাদেরও অনেকে ঈদে দেশে ফেরেন। গত বছর বুয়েটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঈদের আগের চার দিনে ঢাকা ছেড়েছিলেন ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। এবার পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ৬ থেকে ৯ এপ্রিল রাজধানী ছেড়েছেন ৫৭ লাখের মতো মুঠোফোন সিমধারী। মুঠোফোন অপারেটরদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এই হিসাবে এ সময়ে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হবে। রাজশাহীতে বাবা-মা থাকার পরও বেশ কয়েক বছর ঈদে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি মনিরুজ্জামানের। এবার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে গ্রামে গেছেন তিনি। মনির বলেন, নিজের ঘরসংসার, চাকরি নিয়ে ব্যস্ততা, সন্তানদের বন্ধুবান্ধবের নানা পরিকল্পনার জন্য কখনোই ঢাকা ছাড়া হয় না। কয়েকবার একা একা গেলেও ঈদে সপরিবার এবারই প্রথম গেলাম। তিনি আরও বলেন, এখন আমি যখন বাবার ভূমিকায় এসেছি, তখন বুঝতে পারছি সন্তানকে কাছে পাওয়ার আকুতি কী। সন্তানরা তার শিকড় জানতে না পারলে মা-বাবাকে সম্মান করতে শেখে না। ওরা দেশের বাইরে চলে যাবে, কবে ফিরবে জানি না। এখন বুঝতে পারছি কী ভাষণ দেরি করে ফেলেছি। পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে গ্রামে ঈদ করতে গেছেন শহীদুল। তিনি বলেন, জীবনের দৌড়ে কখন যে নিজের চারপাশে দেয়াল তুলে দিয়েছি, টের পাইনি। মা-বাবা যে অপেক্ষায় থাকেন, কখনও বুঝতে চেষ্টা করিনি। এখন বুঝতে পারছি, এই ইট-কাঠের নগরীতে আমার নিজের বলে কিছু নেই। সন্তানকে দাদা-দাদির আদর আর প্রকৃতির সঙ্গ করিয়ে দিতে এবারের ঈদযাত্রা বলে অভিহিত করেন তিনি। মনোরোগ বিশ্লেষক মেখলা সরকার মনে করেন, নাগরিক মানুষ তার দৈনন্দিন মানসিক চাপ সামাল দিতে না পেরে আবারও যৌথ পরিবারের দিকে ঝুঁকছে। তিনি বলেন, মানুষ এখন চাকরি, পারিবারিক জীবন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। একা বড় হতে গিয়ে ডিভাইসের শরণাপন্ন হয়ে বর্তমান প্রজন্ম নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। চার দেয়ালে বন্দিজীবনে তারা মানব সম্পর্ক বোঝে না। ফলে একক পরিবার গড়ে তোলা প্রজন্মই আবার যৌথ পরিবারে ফিরে যাচ্ছে। এবং ফেলে আসা মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করছে। সমাজবিজ্ঞানী নেহাল করীম মনে করেন, এটা আরেকটা ট্রানজিশনের সময়। একসময় আলাদা থেকে চেয়ে একক পরিবার তৈরি করতে মরিয়া প্রজন্ম এখন টের পেতে শুরু করেছে, শিকড় থেকে গাছকে আলাদা করতে চাইলে কী ভীষণ ক্ষতি হয়ে যায়। নিজেদের স্বার্থে তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল আবার নিজেদের স্বার্থেই যুক্ত হতে চাচ্ছে।
Published on: 2024-04-11 20:15:02.859916 +0200 CEST

------------ Previous News ------------