বাংলা ট্রিবিউন
দলের সিদ্ধান্ত না মেনে ভোটে আছেন মন্ত্রী-এমপির যেসব স্বজন

দলের সিদ্ধান্ত না মেনে ভোটে আছেন মন্ত্রী-এমপির যেসব স্বজন

প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনার পরও নির্বাচনি মাঠ থেকে সরেননি মন্ত্রী-এমপির পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। সোমবার প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও তারা মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। উল্টো নানা যুক্তি দেখিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) তাদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে আগামী ৮ মে ভোটগ্রহণ হবে। গত ১৮ এপ্রিল দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী সারা দেশে মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের স্বজনদের উপজেলা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা গত এক সপ্তাহ ফোনে তাগাদা দেন তাদের। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিবৃতি দিয়ে মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের স্বজনদের সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। *দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোটে আছেন যারা* কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের শ্যালক মহব্বত আলী, মনোহরগঞ্জে মন্ত্রীর ভাতিজা মো. আমিরুল ইসলাম, মাদারীপুর সদর উপজেলায় সংসদ সদস্য শাজাহান খানের ছেলে আসিবুর রহমান খান, চাচাতো ভাই পাভেলুর রহমান খান শফিক, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইশরাক চৌধুরী, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন, সোনাতলা উপজেলায় সাহাদারা মান্নানের ছোট ভাই মিনহাদুজ্জামান, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলীর ছোট ছেলে আলী আফসার। মোহাম্মদ আলী ও সফিকুল ইসলাম বর্তমান সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলামের চাচা। আলী আফসার মাজহারুল ইসলামের চাচাতো ভাই। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি দ্রোপদী দেবী আগরওয়ালার পুত্রবধূ প্রিয়া আগরওয়ালা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী রয়েছেন। পাবনার বেড়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন সোমবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকারের ভাই আব্দুল বাতেন এবং ভাতিজা আব্দুল কাদের সবুজ মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হলেন চাঁদপুর-২ আসনের এমপি মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর বড় ভাইয়ের ছেলের স্ত্রী ও উপজেলা মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক লাভলী চৌধুরী। এছাড়া কুষ্টিয়া সদরে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান। তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের চাচাতো ভাই। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ সদস্য আবদুর রাজ্জাকের খালাতো ভাই হারুন অর রশীদ ও মামাতো ভাই মো. মঞ্জুরুল ইসলাম তপন। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ফুফাতো ভাই মো. ইসরাফিল হোসেন। তিনি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। দুই দফায় তিনি দলীয় প্রতীক (নৌকা মার্কা) নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগর টগরের ছোট ভাই উপজেলা চেয়ারম্যান আলী মুনসুর বাবু। তেঁতুলিয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু ও তার ছোট ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান। তারা পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়ার চাচা শ্বশুর। নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আশরাফ খানের সম্বন্ধী (স্ত্রীর বড় ভাই) মো. শরীফুল হক। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় ইতোমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফয়সাল বিপ্লবের চাচা আনিস উজ্জামান আনিস। *দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে দিচ্ছেন নানা যুক্তি* দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বজনদের ভোটের মাঠে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান বলেন, ‘আমাদের খান পরিবারের জনপ্রতিনিধিত্বের একটা ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য আছে। একসময় ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন আমার বাবা। তিনি ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। আমি আটবার নির্বাচিত হয়েছি। এতে বুঝতেই পারছেন, আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য জনগণের সেবা করা। এবার আমার ছেলে ও চাচাতো ভাই প্রার্থী। দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে যদি তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হয়, তাহলে দুজনকেই সরে দাঁড়াতে হবে। এতে শূন্যতা সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রে করণীয় কী, তা দলীয়ভাবে বলা হয়নি। কাজেই আমি মনে করি, গণতান্ত্রিক অধিকার সবার আছে। বিষয়টি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বিবেচনায় রাখবেন বলে বিশ্বাস করি।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পলাশ উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. শরীফুল হক বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে করতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে আমার ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে ঠিক। তবে সংসদ সদস্যের ভরসায় নয়, পলাশের জনগণের ভরসায় আমি এবার প্রার্থী হয়েছি। তাই নির্বাচনের মাঠেই থাকবো এবং জয়ী হবো।’ মাঠে থাকার বিষয়ে একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইশরাক চৌধুরী সাবাব বলেন, ‘এমপিপুত্র ছাড়াও আমি এই দেশের নাগরিক। এলাকার নাগরিক হিসেবে ভোট করার অধিকার আছে আমার।’ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ফুফাতো ভাই ইসরাফিল হোসেন বলেন, ‘আমি নির্বাচনে অবশ্যই থাকবো, এলাকার জনগণ আমাকে পুনরায় বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবেন বলে প্রত্যাশা করি।’ সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলামের শ্যালক মহব্বত আলী বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় এলাকায় এসে বলে গেছেন কেউ নির্বাচন করতে চাইলে কোনও বাধা নেই। আমি ছাত্রলীগ করেছি। যুবলীগ করেছি। পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এখন উপজেলা আওয়ামী লীগে সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান। আমাকে সবাই সমর্থন দিয়েছেন বলে মাঠে এসেছি। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর দলীয় প্রধানের এমন ঘোষণা এসেছে। সিদ্ধান্ত যদি আগে আসতো তাহলে আমরা দলীয়ভাবে সমন্বয় করতাম।’ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করে ভোট করার বিষয়ে জানতে চাইলে মিনহাদুজ্জামান লিটন বলেন, ‘নাটোরের সিংড়া উপজেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন্ত্রী-এমপির আত্মীয়দের সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মূলত যারা নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও প্রভাব বিস্তার করছেন; তাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন। এটি তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। অথচ দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনসহ কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনা বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন। দলীয় প্রতীক কাউ দিচ্ছে না দল; নির্বাচন উন্মুক্ত করে দিয়েছে সবার জন্য। কাজেই আমাদের প্রার্থী হওয়াতে কোনও বাধা নেই।’
Published on: 2024-04-24 04:06:17.578088 +0200 CEST

------------ Previous News ------------