বাংলা ট্রিবিউন
গরমে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার শঙ্কায় ধীরে চলছে ট্রেন

গরমে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার শঙ্কায় ধীরে চলছে ট্রেন

প্রচণ্ড তাপদাহে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেন চলছে ধীরগতিতে। এতে করে কোনও ট্রেনেরই শিডিউল ঠিক থাকছে না। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলে ২ হাজার ২৮৬ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা-চিলাহাটি-পঞ্চগড় ও রাজবাড়ী-ঢাকা রুটের রেললাইনে কংক্রিট স্লিপার আছে। আর ঈশ্বরদী-খুলনা রুটে আছে স্টিলের স্লিপার। বাকি পথে আছে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো কাঠের স্লিপার। এর সঙ্গে মাঝেমধ্যে কংক্রিটের স্লিপারও বসানো হয়েছে। তবে কাঠের স্লিপারই বেশি। এই কাঠের স্লিপারের কারণে দুর্বল ট্র্যাকে ট্রেনে গতি আনা যাচ্ছে না। চলমান প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে এসব রেললাইনই বেশি বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। *অল্পের জন্য বাঁচলো ট্রেন* শুক্রবার (২৬ এপ্রিল) পাবনার ঈশ্বরদীতে বাইপাস রেলওয়ে স্টেশনে রেললাইনের পাত বেঁকে গিয়ে বড় অঘটন থেকে বেঁচে গেছে খুলনা থেকে রাজশাহীগামী আন্তঃনগর ট্রেন কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস। বেঁকে যাওয়া রেললাইনে থাকা খুলনা থেকে ছেড়ে আসা কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনটি থামিয়ে ঈশ্বরদী লোকোসেডের রেললাইন দিয়ে পেছনে টেনে নেওয়া হয়। পরে অপর একটি লাইনের মাধ্যমে রাজশাহীর উদ্দেশে প্রায় ১ ঘণ্টা পরে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। পরে রেলওয়ে অফিসের লোকজন দুই ঘণ্টা রেললাইনের ওপর পানি ঢেলে তাপমাত্রা কমিয়ে আনার পর বেঁকে যাওয়া রেলপথ স্বাভাবিক করেন। রেলওয়ের ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে কর্মরত স্থানীয় শ্রমিক শুভ হোসেন জানান, কপোতাক্ষ ট্রেন ঈশ্বরদী স্টেশন থেকে ছাড়ার পর ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনের কাছে যে লাইনে ট্রেনটি আসছিল সেই রেললাইন দূর থেকে দেখে বাঁকা মনে হচ্ছিল। খবর পেয়ে বিভাগীয় রেলের পরিবহন কর্মকর্তা, সহকারী প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন। ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনের স্টেশন মাস্টার তাওলাদ হোসেন জানান, প্রচণ্ড রোদে দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল তীব্র তাপপ্রবাহে রেললাইন বেঁকে গেছে। এসময় ওই লাইনে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাজশাহী যাচ্ছিল। ট্রেনটি এসময় থামানো হয়। পরে অপর একটি লাইনের মাধ্যমে সেটি রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে অফিসের লোকজন রেল লাইনের ওপর পানি ঢেলে তাপমাত্রা কমিয়ে আনার পর রেলপথ স্বাভাবিক হয়। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, খবর শুনে তাৎক্ষণিকভাবে বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী বাকিয়া তুল্লাহ্সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রেনটি লাইন থেকে পেছনে এনে অন্য লাইন দিয়ে রাজশাহীতে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) শাহ্ সুফি নূর মোহাম্মদ এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। *কাঠের স্লিপার পচে গেছে* রাজশাহীর বাঘার আড়ানী এলাকায় স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে, অনেক কাঠের স্লিপারই পচে গেছে। পর্যাপ্ত পাথর না থাকায় ওই স্লিপার নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তাছাড়া নাট-বল্টু ও ক্লিপ নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। অনেক দিনের পুরোনো এই স্লিপার বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। এর ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন। রাজশাহীর পবা উপচেলার হরিয়ান এলাকায় গিয়েও রেললাইনে স্লিপারের একই অবস্থা দেখা গেছে। স্থানীয় লোকজন জানান, অনেক দিন ধরেই এসব এলাকায় রেললাইনে বড় কোনও সংস্কার দেখা যায় না। নাট-বল্টু খুলে গেলে কিংবা ট্রেন লাইনচ্যুত হলে তখন সংস্কার করা হয়। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আসাদুল হক বলেন, ‘১৯৭৩ সালে রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। একটি রেললাইনের আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ থেকে ২৫ বছর। কিন্তু এই স্লিপার ও রেললাইনের বয়স ৫০ পেরিয়ে গেছে। ফলে ট্রেন চালাতে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কারণ, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে কাঠের স্লিপারের লাইনেরই বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।’ তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে বলে দাবি তার। *ধীরে চলার নির্দেশ* রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) প্রচণ্ড তাপে ঈশ্বরদী-বাইপাস রেললাইনের একটি স্থান বেঁকে যায়। তাই দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই চার কিলোমিটার রেললাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ঝুঁকি থাকায় এই লাইনে ৪০ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর কয়েক দিন আগে দর্শনা-যশোর রেলরুটে লাইন বেঁকে যাওয়ার আশঙ্কায় ট্রেনের গতি ৬০ কিলোমিটারে নামিয়ে চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এখনও এই রুটটিতে সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন চালানো হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আহসান জাবির বলেন, মাত্রাতিরিক্ত গরম বা শীতে লাইন বেঁকে বা ফেটে যায়। এমন লাইনগুলোতে রেলের গতি কমিয়ে আনা হয়। শীত বা গরমের কারণে লাইনে স্ট্রেচিং ও ডিস্ট্রেচিরেঙর ফলে ‘রেল ব্রোকেন’ ও ‘বাকলিং’ (লাইন বেঁকে যাওয়া) হয়ে থাকে। এই অবস্থায় রেল কীভাবে চলবে তার একটি গাইডলাইন আছে। সে অনুযায়ীই এখন ট্রেন চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের কাজও চলছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার বলেন, বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে রেললাইনের তাপমাত্রা সব সময় সাত থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হয়। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে কাঠের স্লিপার এলাকার রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এখনও বড় ধরনের কোনও সমস্যা হয়নি। ঈশ্বরদীতে আগে থেকে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল। তাই সেখানে রেললাইন বেঁকে যায়। পরে মেরামত করা হয়েছে। অসীম কুমার তালুকদার আরও বলেন, কংক্রিট স্লিপার অনেক বেশি লোড নিতে পারে। তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হলেও লাইন বেঁকে যায় না। কাঠের স্লিপারে তা সম্ভব না। কিন্তু স্লিপার স্বল্পতার করণে মেইন লাইনে কাঠের ও স্টিলের স্লিপার বসাতে বাধ্য হই। এখন আমাদের চেষ্টা আছে যেন পরিবর্তনের সময় কংক্রিটের স্লিপারই বসানো যায়। কাজটা একবারে করতে পারলে ভালো। তাহলে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা কমে আসবে। ট্রেনও গতিতে চালানো যাবে।
Published on: 2024-04-26 22:13:05.753613 +0200 CEST

------------ Previous News ------------