বাংলা ট্রিবিউন
‘অগুরুত্বপূর্ণ’ বলেই অনুচ্চারিত?

‘অগুরুত্বপূর্ণ’ বলেই অনুচ্চারিত?

প্রতিষ্ঠিত একটি গানের স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করার স্বপ্ন নিয়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করে মা জানতে পারেন ছেলের গানের ক্লাস রবিবার বিকাল ৪টায়। সেই সন্তানের স্কুল শেষ হয় ৩টায়, আর মায়ের অফিস শেষ হয় বিকাল ৫টায়। গানের ক্লাসে নেওয়ার বিকল্প কেউ পরিবারে নেই। কষ্ট করে ভর্তি হয়েও পছন্দের স্কুলে গান শেখা বাদ দিতে হলো। ইংলিশ লার্নিং অনলাইন কোর্সে ভর্তির জন্য মা কল দিলেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে। সেখান থেকে জানানো হলো— শুক্র বিকাল ৫টা ও শনিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ক্লাস। শুক্রবার সম্ভব হলেও শনিবার মায়ের ছুটি নেই। বাসায় অনলাইনে শিশুটিকে ক্লাসে বসিয়ে দিয়ে বিষয়গুলো বুঝে নেওয়ার মতো কেউ নেই। ফলে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কোর্সে ভর্তি করে একদিনের ক্লাস করানো বিশাল ঝক্কি। বাদ দিতে হলো সে প্রক্রিয়াও। এই যে স্কুলের বাইরে শিশুকে কিছুর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা— তার সবই ব্যর্থ হয় মা কর্মজীবী হলে। তখন প্রশ্ন ওঠে সন্তান মানুষ করতে হলে চাকরিটা ছেড়ে দাও। কেউ প্রশ্ন তোলে না, কেন কর্মজীবী মায়ের সন্তানরা সব সুবিধা পাবে না। কেন সমাজ তাদের জন্য বিশেষ করে ভাববে না। আবার, স্কুলে আনা-নেওয়াও মায়ের জন্য বিশাল মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। বাবার ৯টা-৫টা অফিস হলে সন্তানকে স্কুলে নেওয়ার জন্য মাকেই স্যাক্রিফাইস করতে হয়। এক পর্যায়ে মাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। না হলে বয়স্ক বাবা-মাকে এই দায়িত্ব দিয়ে মনোকষ্ট ও অপরাধবোধ নিয়ে চাকরি চালিয়ে যেতে হয়। আর কথা তুলতে গেলে সব জায়গাতেই শুনতে হয়— আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইসিস আছে না জীবনে? নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, কেবল ‘ডে কেয়ার’ থাকা বা না-থাকা নয়, পুরো প্রতিবেশটাই প্রতিকূল হয়ে উঠেছে মায়ের কাজের জন্য। সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়া, এক্স্ট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ এসব সারাদিন কে করবে— সেটাই স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে। এবং সমাধানে গিয়ে কর্মজীবী মায়ের ওপর প্রথম খড়গ নেমে আসে। কারণ, সমাজ এখনও পুরুষ সদস্যর চাকরি ছাড়ার বিষয়ে প্রস্তুত নয়। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৭ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার এখন নানা কাজে নিয়োজিত। তার মধ্যে নারী ২ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার। ২০২২ সালের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে৷ ওই বছর কর্মক্ষেত্রে নারী ছিলেন দুই কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার। এই তথ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর। বাংলাদেশে এখন মোট সরকারি চাকরিজীবী ১৫ লাখ। তার মধ্যে ২৯ ভাগ নারী। এই আড়াই কোটি নারীর বেশিরভাগ অস্বস্তি নিয়ে চাকরি করেন উল্লেখ করে ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবীর বলেন, ‘কর্মজীবী মা যেন মনে না করে, সন্তানকে সময় দিতে না পেরে কোনও অপরাধ করছে। আমাদের দেশে কর্মজীবী মায়ের জন্য যেহেতু আলাদা মনোযোগ দেওয়া হয় না, শিশুদের গড়ে তোলা নিয়ে সংবেদনশীলতার জায়গা কম— সেহেতু চাকরি চালিয়ে যেতে হলে ‘মা’ কে অস্বস্তি নিয়ে থাকতে হয়। এটা অগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু একেবারেই নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বিপদে পড়ে যায় বলে অনুচ্চারিত রাখতে চায়।’ অনেকেই সন্তান নিতে ভয় পান, সেটা কেবল তার ক্যারিয়ার-প্রীতি নয় উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বলেন, ‘এই সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে কোয়ালিটি সময় দেওয়ার সুযোগ হবে কিনা— সেই চিন্তা থেকে অনেকে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সেটা ঠিক বা বে-ঠিক সেই বিচারে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যারা সন্তান নিতে চান তারাও যখন নেন না, তখন সেটা অবশ্যই চিন্তার। আপনি যদি কর্মজীবী মাও হন, সন্তান লালন-পালন একটা ২৪ ঘণ্টার চাকুরি। সেখানে মা হিসেবে কোনও ছাড় দিতে চাইবেন না। কর্মজীবী মায়েদের সন্তানেরা যেন সব সুবিধা পায়, সেদিকে সমাজকে মনোযোগী হতে হবে। যে গানের স্কুল অফিস-ডে তে বিকাল বেলা, তাদের অবশ্যই ছুটির দিনে করতে পারতে হবে। বা সেই সন্তানের জন্য তারা বিশেষ করে ভাববেন। তবেই না সেটা ইনস্টিটিউট।’
Published on: 2024-04-03 09:30:50.511778 +0200 CEST

------------ Previous News ------------