বাংলা ট্রিবিউন
‘কাজের জন্য ঢাকায় থাকলেও মন পড়ে থাকে গ্রামের বাড়িতে’

‘কাজের জন্য ঢাকায় থাকলেও মন পড়ে থাকে গ্রামের বাড়িতে’

কাজের সুবাদে রাজধানীতে থাকতে হয় অনেককেই। সময় সুযোগের অভাবে যাওয়া হয় না নিজ বাড়িতে, যেখানে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া যায়। তাই ঈদের ছুটিতে পরিবার ও প্রিয়জনের সঙ্গে ছুটি কাটাতে বাড়ি ছুটে যান এসব মানুষ। শত ঝক্কিঝামেলা পেরিয়েও গন্তব্যে যাওয়ার টিকিট হাতে পেলে মুখে হাসি ফুটে ওঠে তাদের। প্রতি বছরই টিকিট পাওয়া না পাওয়া, দীর্ঘ যানজটসহ নানা ঝক্কি পোহাতে হয় ঘরমুখো মানুষকে। তবু বাড়ি যাওয়ার আনন্দ ম্লান হয় না তাদের। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। ঈদ আসতে আর মাত্র ২-৩ দিন বাকি, এসময়ে উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা থাকলেও বাস টার্মিনালগুলো রয়েছে প্রায় ফাঁকা। টিকিট কাটতে কোনও ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না যাত্রীদের। টার্মিনালে এসে সহজেই টিকিট কেটে যেতে পারছেন নিজ গন্তব্যে। এতে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা হয়েছে মসৃণ ও স্বস্তির। এই নির্ঝঞ্ঝাট যাত্রা তাদের আনন্দকে করে তুলেছে দ্বিগুণ। সোমবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সরেজমিন দেখা যায় মানুষের বাড়ি ফেরার নানান চিত্র। যাত্রীরা টিকিট কেটে আয়েশের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। নেই কোনও টেনশন। মো. আকাশ শেখ রাজধানীর হাজারীবাগে একটি পোশাক কারখানায় অ্যামব্রয়ডারির কাজ করেন। সেখানেই একটি মেসে থাকেন তিনি। বাবা-মা ভাই-বোন থাকেন গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে। তাই পরিবারের সবার সঙ্গে  ঈদ করতে যাচ্ছেন গ্রামে। যাওয়ার সময় প্রিয় ছোট ভাইয়ের জন্য একজোড়া পাখি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এই পাখি হাতে পেলেই নাকি ছোট ভাইয়ের সব পাওয়া হয়ে যাবে। তাই ঈদের উপহার হিসেবে পাখি নিয়ে যাচ্ছেন আকাশ। ঈদযাত্রা নিয়ে আকাশ বলেন, অন্যবার রোজার এই সময়ে বাস টার্মিনালে প্রচুর ভিড় থাকতো, এবার সেটা নাই। কাউন্টার ফাঁকাই বলা চলে। এবার যাওয়াটা আরামদায়ক হবে। তিনি বলেন, ছোট থেকে বড় হয়েছি ফরিদপুরে। ওই জায়গায়ই আমার সবকিছু। কাজের জন্য ঢাকায় থাকি, কিন্তু মন পড়ে থাকে বাড়িতে (গ্রামের বাড়ি)। তাই ঈদ বা যেকোনও ছুটিতে বাড়িতে মন ছুটে যায়। বাড়িতে পৌঁছালেই শান্তি লাগে। এই শান্তি অন্য কোথাও পাই না। হাবিবুর রহমান হাবিব ১০ বছর পর গ্রামের বাড়ি মাগুরায় ঈদ করতে যাচ্ছেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এবার প্রথমবারের মতো তার বাড়িতে যাওয়া। হাবিব বলেন, আমরা সবাই মূলত ঢাকায় থাকি। এবার আমার বড় ভাইয়েরা তাদের পরিবার নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে। তাই আমরাও যাচ্ছি। সবাই একসঙ্গে ঈদ করবো। এবারের ঈদটা সত্যিই বিশেষ কিছু হতে যাচ্ছে আমাদের জন্য। অনেক বছর পর সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করবো, এটার আনন্দই আলাদা। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী-বাচ্চাদের নিয়ে এবারই প্রথম আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি। নতুন একটা পরিবেশ পাবে। বাচ্চাদের জন্য নতুন পরিবেশ, ওদের বেশ ভালোই লাগবে আশা করি। ঝিনাইদহে বাড়ি সঞ্জীবের। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আজকেও তার অফিস খোলা ছিল। হাফ অফিস কাজ করে দুপুরে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সঞ্জীব বলেন, কাল থেকে আমার ছুটি শুরু। বসকে বলে আজকে হাফবেলা ডিউটি করে চলে এসেছি। রাতের মধ্যে বাড়ি চলে গেলে শেষ রোজাটা সবার সঙ্গে কর‍তে পারবো। তিনি বলেন, বাড়িতে গেলে যেই শান্তিটা পাই তা আর কোথাও পাই না। ঢাকায় অনেক সুযোগ সুবিধা।  চাইলেই আমি হাতের কাছে সবকিছু পাই। কিন্তু তারপরও আমার ঝিনাইদহই ভালো লাগে। যখনই বাসা থেকে ঝিনাইদহের উদ্দেশে বের হয়েছি, তখন থেকেই ভালো লাগা শুরু হয়েছে। কখন বাড়ি পৌঁছাবো সেই অপেক্ষায় আছি। এভাবে নিজের মনোভাব প্রকাশ করেন সঞ্জীব। প্রতি বছরই ঈদযাত্রা ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়ে পার করেন ঘরমুখো মানুষেরা। টিকিটের অপ্রতুলতা কিংবা রাত জেগে টিকিটের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, রাস্তার যানজটসহ নানামুখী ঝামেলা লেগেই থাকতো। এসব উপেক্ষা করেই তারা ছুটতেন বাড়ির পথে। এবারের চিত্র পুরোই ভিন্ন। বাস টার্মিনালে নেই যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। বাস কাউন্টারগুলোও প্রায় ফাঁকাই। টার্মিনালের এই নীরব চিত্র পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ভালো না লাগলেও তা ভালো লাগছে যাত্রীদের। বিভিন্ন বাস কাউন্টারের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তাদের যাত্রী আগের মতো নেই। ঈদের দুদিন আগে যাত্রীর যে চাপ থাকার কথা, এবার তার কিছুই নেই। তারা বলেন, ভোরবেলা আর রাতে কিছুটা যাত্রী পান তারা। আর সারা দিন কোনোরকমে চলে। কামরুল ইসলাম স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চুয়াডাঙ্গা যাবেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদ করবেন সেখানে। টার্মিনালে যাত্রীদের উপস্থিতি কম থাকা নিয়ে তিনি বলেন, আগে এরকম সময়ে টার্মিনালে পা রাখার জায়গা থাকতো না। বাচ্চাদের নিয়ে কষ্ট করেই যেতাম। এবার খালি টার্মিনালে এসে শান্তি লাগছে। টিকিট পেতে কোনও সমস্যা হয়নি। এখন বাস ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করছি। বাড়ি যাবো। অনেক যাত্রী আগেই বাড়িতে চলে যাওয়ার কারণে এবার শহর আগেই ফাঁকা হয়েছে। তাই বাস কাউন্টারও ফাঁকা। এটা আমাদের জন্য ভালো হয়েছে। যারা আগে চলে গেছে তারাও শান্তিতে যেতে পেরেছে। আবার আমরাও এখন শান্তিতে যেতে পারছি। এমনটাই বলছিলেন ঈদে ঘরমুখো এক যাত্রী কায়সার আহমেদ। শামীম হোসেন নামের আরেক যাত্রী যাবেন ফরিদপুরে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কাউন্টার ফাঁকা থাকলে কী হবে, টিকিট পাচ্ছি না। যাত্রী তো কম, তাহলে টিকিট কেন থাকবে না?  আমার ধারণা তারা টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছে। পরে বেশি দামে বিক্রি করবে।
Published on: 2024-04-08 18:47:34.252341 +0200 CEST

------------ Previous News ------------