ইত্তেফাক
আচরণবিধি প্রয়োগে ইসির গাছাড়া ভাব

আচরণবিধি প্রয়োগে ইসির গাছাড়া ভাব

*দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপসিল ঘোষণার পর পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও নির্বাচন আচরণবিধি ভঙ্গের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তেমন তৎপরতা নেই। নির্বাচন মাঠ প্রশাসনের হাতে ছেড়ে দিয়ে গাছাড়া ভাব ইসির। গতবারের নির্বাচনের তুলনায় এবার বিধিলঙ্ঘন কিছুটা কম হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার সব নির্বাচনি এলাকায় এখনো বহাল। কমিশন এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠালেও তার ফলাফল শূন্য। দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহে মিছিল ও শোডাউনও নির্বাচনি আচরণ-পরিপন্থী। এ সময় সম্ভাব্য প্রার্থী ও তার সমর্থকদের নির্বাচনি পোস্টার- ফেস্টুন বহন করা ও কোনো প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়াও নির্বাচনি আচরণ-পরিপন্থী। কিন্তু নির্বাচন কমিশন গতকাল সোমবার পর্যন্ত এ বিষয়ে দলগুলোকে সতর্ক করেনি।* যদিও নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেছেন, ‘আমাদের প্রতি আস্থা রাখুন। নিশ্চয় আমরা লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করব।’ বিএনপি নির্বাচনে এলে ভোটের তারিখ পেছানোর ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএনপিসহ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া অন্যান্য দল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলে পুনঃতপসিলের বিষয়টি বিবেচনা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটে আসার কথা জানাতে হবে। এদিকে, দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহের বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল, অতিরিক্ত লোকসমাগম ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে হবে। প্রত্যেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সর্বোচ্চ দুই জনকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেউই তা মানছেন না। এ পরিস্থিতিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কর্মী-সমর্থকদের প্রচণ্ড ভিড়ে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জন ও যান চলাচলে একধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের মূল ফটকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কার্যালয়ের ভেতর থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, শৃঙ্খলা না ফিরলে মনোনয়নপত্র বিক্রি করা হবে না। অন্যদিকে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনেও দলের মনোনয়নপত্র বিতরণে সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা আচরণবিধি মানছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিন লেখা ফেস্টুন-পোস্টার বহন করছেন। অনেকে লাঙ্গল নিয়ে মিছিলসহ আসছেন। এছাড়াও তপসিল ঘোষণার পরও সারা দেশে আগাম প্রচার-সামগ্রী এখনো অপসারণ করা হয়নি। আচরণবিধিতে যা বলা আছে :সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধির ১১২ বিধিতে বলা আছে,  ভোটগ্রহণের  জন্য নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহ সময়ের আগে কোনো প্রকার নির্বাচনি প্রচার শুরু করা যাবে না। আর ১৭ বিধিতে এই মর্মে বলা আছে যে, এ ধরনের প্রচারকে ‘নির্বাচন পূর্ব অনিয়ম’ হিসেবে গণ্য করা হবে। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ এ অনিয়ম করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। কোনো দল এ নিয়ম অমান্য করলে অনধিক ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী :সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বাড়ছে। এবার ভোটের মাঠে নিয়োজিত থাকবে বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ সদস্য। বেড়েছে তাদের বাজেট বরাদ্দও। ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের কাছে ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা চেয়েছে বাহিনীগুলো। বিপরীতে অর্থমন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী বরাদ্দ দিয়েছে ইসি। ইসি সূত্র জানায়, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট ৬ লাখ ৮ হাজার সদস্য মোতায়েন ছিল। তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫৬৫ কোটি টাকা। গতবারের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ সদস্য বেড়ে এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে শুধু আনসারই থাকবে ৫ লাখ ১৬ হাজার। আর পুলিশ ও র‍্যাব মিলে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯১ জন। এছাড়া ২ হাজার ৩৫০ জন কোস্টগার্ড ও ৪৬ হাজার ৮৭৬ জন বিজিবি সদস্য নির্বাচনে মোতায়েন থাকবে। ভোট পূর্ববর্তী সময়, ভোটের দিন এবং ভোটপরবর্তী সময়—এই তিন ভাগে নির্বাচনের মাঠের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবেন আইনশৃঙ্খলার এসব বাহিনীর সদস্যরা। এবারের নির্বাচনের জন্য প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে নির্বাচন কমিশন। এর বেশিরভাগই ব্যায় হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেছনে। বৈঠক সূত্র বলছে, বাজেট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুসরণ করে রেঙ্ক অনুযায়ী প্রত্যেক বাহিনীর সদস্যদের দৈনিক ভাতা নির্ধারণ করা হয় এই বৈঠকে। এরমধ্যে পুলিশ ও র‍্যাবের জন্য বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে গড়ে দৈনিক ৫১৪ টাকা করে। বিজিবি সর্বনিন্ম ৪০০ ও সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা, কোস্ট গার্ড সর্বনিম্ন ৬৩৭ টাকা ও সর্বোচ্চ ১৮০০ টাকা এবং আনসারের দৈনিক খোরাকি ভাতা সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বৈঠকে বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে ইসির কাছে পৃথক চাহিদা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তারা কিছু অর্থ আগামও চেয়েছে। তবে চাহিদার বিষয়ে ইসির তরফ থেকে কিছুই জানানো হয়নি। জ্বালানি, ভাতা, খাবার ইত্যাদি খাতে বাহিনীগুলো নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য চাহিদা দেয়। সে চাহিদা পর্যালোচনা করে বরাদ্দ দেয় কমিশন। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ সাংবাদিকদের বলেন, বরাদ্দ প্রাপ্তির সাপেক্ষে আমরা কতটুকু দিতে পারব, সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে এলে পুনঃতপশিল বিবেচনা করা হবে :বিএনপি নির্বাচনে এলে ভোটের তারিখ পেছানোর ইঙ্গিত দিয়ে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেছেন, বিএনপিসহ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া অন্যান্য দল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলে পুনঃতপশিলের বিষয়টি বিবেচনা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটে আসার কথা জানাতে হবে। গতকাল সোমবার নির্বাচন ভবনের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। আগের বারও ওনারা (বিএনপি) একটু পরেই নির্বাচনে এসেছিলেন এবং সুযোগটা পেয়েছিলেন। তাই তারা যদি ফিরতে চান, কীভাবে কী করা যায়, এ নিয়ে নিশ্চয় আমরা আলোচনা করব। তপসিল পেছানোর জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছে জাতীয় পার্টি-জাপা— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়টায় আমরা কিছুই বলব না। অগ্রিম বলার সময় এখনো আসেনি। যখন আসবে, যেটা হবে সেটাই বলব।
Published on: 2023-11-21 03:18:19.977666 +0100 CET