ইত্তেফাক
জিআইজেএন’র তালিকা: বাংলাদেশে বছরের সেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

জিআইজেএন’র তালিকা: বাংলাদেশে বছরের সেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

*২০২৩ সালে গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন)-এর তালিকায় বাংলাদেশের সেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো উঠে এসেছে। এতে মোট আটটি প্রতিবেদন স্থান পেয়েছে। বুধবার (২০ ডিসেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জিআইজেএন।* এতে বলা হচ্ছে, বছরের সেরা অনুসন্ধানী রিপোর্টগুলো খুঁজে বের করা বেশ দুঃসাধ্য হলেও ফলপ্রসূ একটি কাজ। তারা বাংলাদেশে ৪৫টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল, ১২০০ দৈনিক সংবাদপত্র এবং শত শত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঘেঁটে একটি তালিকা তৈরি করেছে। তারা বলছে, ২০২৩ সালের শীর্ষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো বাছাই এবং অনুসন্ধান করার সময় আমরা উপলব্ধি করি যে, কীভাবে নিউজরুম তথা রিপোর্টাররা ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে অসামান্য তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন দ্বারপ্রান্তে। এ সময়ে ভুল তথ্য ও ডিজিটাল হুমকির উত্থান, গভীরতর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সঙ্কুচিত নাগরিক স্থানের সঙ্গে এ বছরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো আরও তাৎপর্যপূর্ণ। জিআইজেএন-এর বাছাই করা প্রতিবেদনগুলোতে স্থান পেয়েছে নির্বাচনের আগে ভুল তথ্য প্রচার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দুর্নীতি, নারীদের অনলাইন হয়রানি, স্বাস্থ্য খাতে পদ্ধতিগত অনিয়ম এবং কৃষি শ্রমিকদের শোষণের গল্পগুলো। সংবাদপত্র, টিভি নেটওয়ার্ক, অনলাইন পোর্টাল, বৈশ্বিক সংবাদ সংস্থা, আঞ্চলিক অলাভজনক সংস্থা, নির্বাসিত নিউজরুম এবং আরও উল্লেখযোগ্যভাবে- স্থানীয় সংবাদের ওয়েবসাইট এবং রিপোর্টারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এই প্রতিবেদনগুলো আসে। *জিআইজেএন'র তালিকায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সেরা প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে রয়েছে-* *'বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে ভুয়া বিশেষজ্ঞরা গুজব ছড়াচ্ছে'* - তালিকায় প্রথমেই রয়েছে এএফপি’র এই রিপোর্ট। এর সারমর্ম তুলে ধরা হয়েছে এভাবে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ যখন সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে এই প্রক্রিয়া বয়কট করেছে। যার ফলে দেশটি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখোমুখি হচ্ছে। ভোট ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এএফপির তদন্তে দেখা গেছে, প্রায় তিন ডজন ভুয়া বা অজানা লেখকের লেখা ৭০০টিরও বেশি সরকারপন্থী নিবন্ধ মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুসন্ধান এবং তাদের পরিচয়পত্রে উদ্ধৃত সংস্থাগুলোর সঙ্গে সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে সাংবাদিকরা ওইসব অজানা লেখকদের কোনো অনলাইন উপস্থিতি বা যাচাইযোগ্য রেকর্ড খুঁজে পাননি। উদাহরণস্বরূপ, একজন অজানা লেখক ভারতীয় এক অভিনেত্রীর ছবিসহ ভুয়া নাম ব্যবহার করে বর্তমান সরকারের প্রশংসা করে অন্তত ৬০টি আর্টিকেল প্রকাশ করেছেন। এএফপি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই সন্দেহজনক নিবন্ধগুলোর উত্থানের সন্ধান পেয়েছিল। *'ডাক্তারদের পটাতে চেক বাড়ি গাড়ি সবই'* - তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে চট্টগ্রামভিত্তিক একুশে পত্রিকার এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি। এর সারমর্ম তুলে ধরা হয়েছে এভাবে, ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে চিকিৎসকদের উপহার গ্রহণ এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন গ্রহণ বাংলাদেশে একটি ব্যাপক ও সুপরিচিত প্রথা। এর মাধ্যমে তারা তাদের ওষুধের প্রচারণা চালান, যা ‘ফার্মাসিউটিক্যালস মার্কেটিং প্রাক্টিসের’ যে কোডগুলো রয়েছে তার লঙ্ঘন। এছাড়া ওষুধ কোম্পানিগুলোর এসব কাজের জন্য রোগীদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রোগীদের দিয়ে অতিরিক্ত টেস্ট বা পরীক্ষা করানোর জন্য চিকিৎসকরা বড় আকারের কমিশন পান। *কার দোষে ওরা ‘বড় অপরাধী’?* - তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে চট্টগ্রামভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিভয়েস-এর এই প্রতিবেদন। তাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৮ বছরের কম বয়সী ২২০ জন বন্দি রয়েছে, যাদেরকে ভুলভাবে 'প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ব্যর্থতাগুলো সরাসরি ১০ বছরের পুরানো একটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুলিশকে সম্ভাব্য অপ্রাপ্তবয়স্ক বন্দির সঠিক বয়স নথিভুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করতে হবে এবং যদি তারা না পারে তবে ব্যক্তিকে শিশু হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিবেদক এ ধরনের ১০টি মামলার তদন্ত করেন, মামলার রেকর্ড বিশ্লেষণ করেন এবং ভুক্তভোগী, তাদের পরিবারের সদস্য, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৈশোর সত্ত্বেও, অভিযুক্তদের নিয়মিত প্রাপ্তবয়স্ক বন্দিদের পাশাপাশি রাখা হয়েছিল। জামিন পাওয়ার পরেও এই অপ্রাপ্তবয়স্করা ট্রমা এবং সামাজিক কলঙ্কের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। জিআইজেএন'র তালিকায় চার নম্বরে আছে *'টেলিগ্রাম অ্যাপে নারীদের হেনস্তা'* নিয়ে চ্যানেল-২৪ এর সার্চলাইটের অনুসন্ধান। সেখানে বেরিয়ে আসে, টেলিগ্রাম অ্যাপভিত্তিক একটি অপরাধী চক্রের কার্যক্রম। তারা তরুণীদের ব্যক্তিগত ভিডিও ও ছবি টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। অর্থের বিনিময়ে তারা এসব ছবি ও ভিডিও বিক্রি করতো। আবার কখনো কখনো ভিকটিমকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করতো তারা। রিপোর্ট অনুযায়ী, দাবিকৃত টাকা না পেলে অনলাইনে এসব ব্যক্তিগত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতো অভিযুক্তরা। কনটেন্ট বিক্রি করতে তারা ফেসবুক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে প্রমোশনাল ভিডিও তৈরি করতো, যাতে ওই ভিডিওর কিছু অংশ জুড়ে দেওয়া থাকতো। সাংবাদিক ওই টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হয়ে প্রিমিয়াম কনটেন্ট হিসেবে বিক্রি হওয়া বেশ কয়েকটি ভিডিও নথিভুক্ত করেন। এসব ভিডিও দুই শতাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। রিপোর্টে ভিকটিমের সাক্ষাৎকারও যুক্ত করা হয়েছে, যাদের একজন আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। পুলিশ এরপর বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তালিকায় এরপরেই আছে *‘এলিট ফোর্স র‍্যাব যেভাবে বাংলাদেশের জনগণকে আতঙ্কিত করে’* শিরোনামে ডয়েচে ভেলের ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিট এবং সুইডেনভিত্তিক নেত্র নিউজ যৌথ অনুসন্ধান। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, র‍্যাব বাহিনীতে কাজ করা দুই সদস্য ‘ডেথ স্কোয়াড’-এর ভেতরের তথ্য জানান। র‍্যাব কীভাবে কাজ করে তার বিস্তারিত জানান তারা। প্রতিবেদনে হুইসেলব্লোয়ারদের দাবি নানাভাবে ক্রস-চেক করা হয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই রিপোর্ট অস্বীকার করে একে ‘কাল্পনিক, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করেছে। মার্কিন দূতাবাস র‍্যাবকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তায় তার অতীতের ভূমিকা স্বীকার করেছে। কিন্তু তারা জানিয়েছে, ২০১৮ সালেই তারা তাদের ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে র‍্যাব এবং কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করেছেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে র‍্যাব ৭০০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তালিকায় এরপরে আছে *'কার ডাকে দুবাইয়ে সাকিব আল হাসান'* শীর্ষক প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনটি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবথেকে জনপ্রিয় ক্রীড়া তারকা সাকিব আল-হাসান দুবাইতে একটি জুয়েলারি শপ উদ্বোধনে যান। কিন্তু যে ব্যক্তির আমন্ত্রণে তিনি দুবাই গিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা মামলার আসামি। কীভাবে একজন পলাতক আসামি থেকে দুবাইতে এত বড় জুয়েলারি শপের মালিক হলেন ওই ব্যক্তি তা ওই রিপোর্টে উঠে এসেছে। অপরাধ ঘটিয়ে তিনি পরিচয় পাল্টে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে বিয়ে করে পরে তিনি দুবাইতে স্থায়ী হন। প্রতিবেদনে তার ব্যবসার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া তালিকায় এরপরে আছে *'নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলাদেশি রাজনীতিকের সন্দেহজনক সম্পত্তি ক্রয়'* সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট’ বা ওসিসিআরপি তাদের ওয়েবসাইটে করা একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ে একাধিক বাড়ি কিনেছেন। বিষয়টি নির্বাচনী হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেননি। তিনি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই সম্পদ কিনেছেন। এর আগে তিনি অনেক কম বেতনে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতেন। এমনকি তিনি ক্যাব ড্রাইভার হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০০৯ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর স্পেশাল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই পদে নিযুক্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় ২০১৪ সাল থেকে তিনি নিউ ইয়র্কে সম্পদ কিনতে থাকেন। ২০১৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পরেও তার সম্পদ ক্রয়ের ধারা অব্যাহত ছিল। ওসিসিআরপি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, ওই এমপি কীভাবে বাড়ি কিনতে এত এত অর্থ পেলো। যেহেতু তার সরকারি বেতন ছিল মাসে মাত্র এক হাজার মার্কিন ডলার। তালিকায় সবশেষে আছে *'বাংলাদেশে সেচপাম্প মালিকদের নিষ্পেশনের শিকার খরাকবলিত কৃষকরা'* শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। এতে সেচপাম্পের মালিকদের তাদের 'ওয়াটার লর্ডস' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব 'ওয়াটার লর্ডস'রা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে লাখ লাখ কৃষকের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বহুদিন ধরে। দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রায় মাসব্যাপী সরজমিন ঘুরে এসে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে 'দ্য থার্ড পোল'। প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে স্থানীয় কৃষকদের ওপরে প্রভাবশালী পানি নিয়ন্ত্রকদের প্রবঞ্চনার নানা গল্প। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ওই অঞ্চলটি দেশের ৪০ শতাংশ ধান উৎপাদন করে। কিন্তু এই 'ওয়াটার লর্ডস'দের নিষ্পেষণের সামনে অসহায় এই কৃষকরা। গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি সরবরাহের জন্য উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট তদারকি না থাকায় পাম্প মালিকরা দরিদ্র কৃষকদের কাছ থেকে সেচের পানির জন্য চড়া মূল্য নিয়ে থাকে। রিপোর্টে কৃষকদের ওপর এই নিষ্পেষণের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। এর প্রভাবে দুই কৃষকের আত্মহত্যাও করেছেন, যা রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে।
Published on: 2023-12-21 06:44:56.183088 +0100 CET