ইত্তেফাক
সাঙ্গুতে গ্যাস মজুতাগার হচ্ছে না, বিকল্প উপায় খুঁজছে পেট্রোবাংলা

সাঙ্গুতে গ্যাস মজুতাগার হচ্ছে না, বিকল্প উপায় খুঁজছে পেট্রোবাংলা

*পরিত্যক্ত সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অবকাঠামোকে মজুতাগার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা থেকে পিছু হটল সরকার। এলএনজি ও এলপিজি আমদানিসহ অবকাঠামোটির বহুমুখী ব্যবহারে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল রাষ্ট্রায়াত্ত সংস্থা (পেট্রোবাংলা)। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সাগরে গ্যাস পাওয়া গেলে তা সঞ্চালনেও সাঙ্গুর অবকাঠামো ব্যবহার করার নতুন সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছিল সংস্থাটি।* ফুরিয়ে যাওয়া সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অবকাঠামো ব্যবহারের উপযোগিতা নির্ধারণে মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিলকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দিয়েছিল বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। অবকাঠামোটি ব্যবহারের উপযোগিতা নেই বলে প্রতিবেদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাটি। দেশের সমুদ্রভাগে আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত একমাত্র খনিটিতে মজুতের পর তা উত্তোলন ও সরবরাহ করতে গেলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গ্যাস নষ্ট হবে বলে এক্সনমবিল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, দেশের সমুদ্রবক্ষে একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গু বন্ধ হয়েছে ২০১৩ সালের অক্টোবরে। গ্যাসক্ষেত্রটির মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার পর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও এর অবকাঠামো রয়ে গেছে। এই অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে বছরে সরকারের খরচ প্রায় ১ কোটি টাকা। পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রটির গ্যাস উত্তোলন প্ল্যাটফরমের বিভিন্ন মালপত্র বিভিন্ন সময়ে চুরি হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সাঙ্গু গ্যাস উত্তোলনের প্ল্যাটফরমটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ধারণ করতে পেট্রোবাংলার পরিচালককে (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি-পিএসসি) প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রকে মজুতাগার হিসেবে ব্যবহারের জন্য গত এক দশক ধরে পরিকল্পনা করছিল সরকার। বিশ্ববাজার থেকে স্বল্পমূল্যে এলএনজি আমদানি করে তা গ্যাসে রূপান্তর করে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত পরিত্যক্ত ঐ ক্ষেত্রটির ভূগর্ভে মজুত করার চিন্তা ছিল। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম ও চাহিদা বাড়লে এই মজুতকৃত গ্যাস ব্যবহার করা হবে। নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গ্যাসক্ষেত্রটি পুনর্ব্যবহারের বিষয়ে ২০২১ সালে সমীক্ষা শুরু হয়। গ্যাসক্ষেত্রটি ভূগর্ভস্থ গ্যাস মজুতাগার হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত কি না, তা নির্ধারণে সম্ভাব্যতা জরিপের জন্য ঐ বছর মার্কিন বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি এক্সনমবিলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে দেশের পেট্রোবাংলা। এক্সনমবিলের সমীক্ষায় ক্ষেত্রটিতে কী পরিমাণ গ্যাস মজুত রাখা সম্ভব এবং মজুতকৃত গ্যাসের সংরক্ষণ ও পুনরুৎপাদনের সম্ভাব্য খরচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাঙ্গুর প্রাথমিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রথমে কাগজে কলমে নিরীক্ষা করে এক্সনমবিল। এ নিরীক্ষার এ পর্যায়ে সাঙ্গুতে ভূগর্ভস্থ মজুতাগার স্থাপন করা সম্ভব বলে দাবি করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি। পরে মাঠ পর্যায়ে বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা বা সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সাঙ্গুতে গ্যাস মজুতের পর উত্তোলনে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে। কেননা, মজুত রাখা গ্যাসের ২০-৩০ শতাংশের বেশি পুনরায় উত্তোলন বা ব্যবহার করা যাবে না। পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাঙ্গুর অবকাঠামো এখন সরাতে হলে কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করতে হবে। এটি আর্থিক বিবেচনায় যৌক্তিক নয়। পরিত্যক্ত হওয়ার পর গত ১০ বছরে ঐ স্থান থেকে অনেক যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের মালপত্র চুরির সময় ছয় জনকে আটক করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে অবকাঠমো না সরিয়ে ভবিষ্যতে সাগরে গ্যাস পাওয়া গেলে এটি ব্যবহার করা যাবে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেটি করা হলে প্রতি বছর অবকাঠামোটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এতে কী পরিমাণ ব্যয় হবে, সেটিও দেখা হচ্ছে। দেশের ১৬ নম্বর ব্লকের সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রটি উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির (পিএসসি) মাধ্যমে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি পিএলসিকে। ১৯৯৬ সালে তারা সেখানে গ্যাস আবিষ্কার করে। ১৯৯৮ সালের ১২ জুন এই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ শুরু হয়। কমপ্রেসর বসানোর পর গ্যাসক্ষেত্রটির মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ২০১০ সালে কেয়ার্ন গ্যাসক্ষেত্রের পরিচালন ভার সান্তোসের কাছে হস্তান্তর করে চলে যায়। গ্যাসক্ষেত্রের মোট মজুত ধরা হয়েছিল ৫৭৭ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ঘনফুট (বিএসএফ)। ২০১৩ সালের অক্টোবরে পরিত্যক্ত ঘোষণার আগে ৪৮৭ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়।
Published on: 2023-12-26 01:09:37.452844 +0100 CET