ইত্তেফাক
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ ইসি

ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ ইসি

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের (সম্ভাব্য প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারউ প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার) ভূমিকায় ক্ষুব্ধ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতিমধ্যে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে গোপন বৈঠকও করেছেন। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগেই প্রার্থীদের সঙ্গে সখ্যর খবর চাউড় হওয়ায় ইসির নীতিনির্ধারকরা বিব্রত ও হতাশ। খবর ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রের। ইতিমধ্যে যারা প্রার্থীদের আমন্ত্রণে তাদের আনুকূল্য পেতে সভায় মিলিত হয়েছেন তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনি বিধি-ভঙ্গের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নিদের্শনা দিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক কর্মী বা তাদের এজেন্ট না। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো ব্যক্তির না তারা রাষ্ট্রের। তাদের ওপরে যে অর্পিত দায়িত্ব রয়েছে তা লঙ্ঘন করার সুযোগ নেই। এমনকি বিধি-ভঙ্গ করে কারো আনুকূল্য পেতে সভায় মিলিত হওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যারাই এই কাজটি করছেন বা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা নিদের্শনা দিয়েছি। আগামীতে যাতে আর কেউ এ ধরনের অনৈতিক কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত না করেন সেজন্য আমার বিভাগীয় পর্যায়ের সফরেও কঠোরভাবে অনুশাসন দিয়ে এসেছি। এর পরও যারা করবেন তাদের বিষয়ে উপযুক্ত আইনের আলোকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইসির কর্মকর্তারা জানান, ভোট সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদেও ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে তাদের প্রশিক্ষণ শুরু করেছে ইসি। এসব কর্মকর্তারা যদি দায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার আগেই অনৈতিক কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ফেলেন তাহলে ভোট কার্যক্রমটিই বিতর্কিত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে অনেক এলাকায় ক্ষমতাসীন সমর্থিত মন্ত্রী ও এমপিরা বা প্রভাবশালীরা পছন্দের ভোট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগাম বৈঠক করছেন। লক্ষ্য কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ আগেই নিয়ে নেওয়া। এটা যে কোনো স্তরের নির্বাচনের ক্ষেত্রে অশনিসংকেত। ইতিমধ্যে কয়েকটি ঘটনা ইসির দৃষ্টিতে এসেছে। কমিশন এ নিয়ে বিব্রত ও হতাশ। কমিশন থেকে এত কঠোর বার্তা দেওয়ার পরও নিজেদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কলুষিত করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে কেন্দ্রের সম্ভাব্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব কর্মকর্তাদেও বিষয়ে কমিশন কঠোর ব্যবস্থা নিতে নিদের্শনা দিয়েছেন। বারবার সতর্ক করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)সহ অন্য চার কমিশনার। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এর আগে গাইবান্ধায় ১৩৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সর্বশেষ হবিগঞ্জের ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তা চন্দনা দাসকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর আগে পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইসির কর্মকর্তারা বলেন, এবার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে মাঠ পর্যায়ের তদন্ত করে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ভোটকেন্দ্র থেকে গ্রেফতার হয়েছেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। অনেক কর্মকর্তা চাকুরিও হারিয়েছেন। তারপরও এদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী তার বাসায় প্রিজাইডিং অফিসারদের নিয়ে গোপন বৈঠক করেছেন। এর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ফাঁস হয়েছে। এর আগে কুমিল্লায় প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের নিয়ে গোপন বৈঠক আয়োজন করেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। সেখানে আচমকা হাজির হন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। রবিবার (২৪ ডিসেম্বর) কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলায় হোটেল এলিট প্যালেসের চার তলায় এ ঘটনা ঘটে। কলেজ শিক্ষকদের (প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হিসাবে তালিকাভুক্ত) নিয়ে হোটেলটির চার তলায় দেবীদ্বার উপজেলা কলেজ শিক্ষক সমিতি কর্তৃক বর্ষসমাপনী মিলনমেলার ব্যানারে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যারা আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনি কেন্দ্রের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে আবেদন করেছেন। *দায়িত্ব পালন অপারগতা:* ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত তদবির করছেন তারা। নির্বাচন কমিশনে বিভিন্ন মাধ্যমে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার নাম কর্তনের জন্য হিড়িক পড়েছে। অনেকে অসুস্থতার কথা বলে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা পালনে অনীহা প্রকাশ করছেন।
Published on: 2023-12-29 00:10:47.224472 +0100 CET