ইত্তেফাক
ব্যাংক লুটের সাহস কোথায় পেল কেএনএফ

ব্যাংক লুটের সাহস কোথায় পেল কেএনএফ

১৫ ঘণ্টার মধ্য বড় আকারের দুটি ব্যাংকের তিন শাখায় লুট করা অবশ্যই নিরাপত্তাগত বিবেচনায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ঘটনাটিকে ‘ব্যাংক ডাকাতি‘ আখ্যা দেওয়া হলেও তা নিছক চোর-ডাকাতের মামুলী অপরাধকর্ম নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এসব সন্ত্রাসমূলক কার্যক্রম করেছে। এসব সশস্ত্র পন্থায় তারা ডাকাতিকে উপলক্ষ করেছে বটে, কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য আরও বড় ও সুদূরপ্রসারী। তবে পাহাড়ি-বাঙালিসহ সবার এখন একটাই প্রশ্ন, সন্ত্রাসী সংগঠন কেএনএফ দেশে ব্যাংক লুটের সাহস পেল কোথায়। শান্তিচুক্তি বিরোধী এই সংগঠনের সাথে যখন সরকারের শান্তির আলোচনা চলমান, তখন এই ধরনের হামলার মাধ্যমে কেএনএফ কী বার্তা দিতে চায়? বান্দরবনের গহীন অরণ্যে জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দিতো কেএনএফ। র‍্যাবসহ যৌথ বাহিনী তাদের জঙ্গি আস্তানা গুড়িয়ে দেয়, অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে তারা আত্মগোপনে চলে যায়। কেএনএফ এর প্রধান নাথান বম সীমান্তের ওপরে তার নিজের বাড়িতে আত্মগোপনে চলে যান। তাদের একের পর এক আটক ও অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছিল। এক পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব আসে। কেএনএফ আত্মসমর্পণ করবে। আর এই আলোচনা সফল করার দায়িত্বে ছিলেন বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা কে। তিনি ওই এলাকার শান্তি কমিটিরও চেয়ারম্যান। শান্তি আলোচনার নামে কুকি চিন অত্র এলাকায় নেটওয়ার্কে শক্তিশালী করেছে। আপোষ তো দূরের কথা, শক্তি বৃদ্ধি করে ফেলেছে, গহীন অরণ্যে আস্তানাও গড়েছে। পাহাড়ি-বাঙালি নেতৃবৃন্দ জানান, যাদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা কেএনএফ এর সাথে সরাসরি জড়িত। তারা নিয়মিত চাঁদার ভাগ পায়। তাদের চাঁদার টাকায় ওই সব নেতাদের বিলাসি জীবন চলে। এসব মুখোশধারীরা একদিকে এলাকার জনপ্রতিনিধি, আবার অন্যদিকে কেএনএফ এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেন। আলোচনা না চালিয়ে র‍্যাবসহ যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলে, প্রকাশ্যে ব্যাংক লুটের মতো এতো বড় দুঃসাহস তারা দেখাতে পারতো না। ৪০০ গজের মধ্যে ছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান। এই বেস্টনির ভিতরে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ব্যাংক লুট করলো তারা। পুলিশ ও আনসারদের ১৫টা অস্ত্রও ছিনিয়ে নিয়েছে। মঙ্গলবার রাত ৯টায় প্রথমে রুমা উপজেলায় সোনালি ব্যাংক শাখায় লুট করে। শতাধিক কেএনএফ এর সদস্য অস্ত্র নিয়ে ব্যাংকটি ঘেরাও করে। পুলিশের ১০ জন সদস্য ছিল পাশে, ইউএনও এর বাসার আনছারও ছিল। ব্যাংকের ভোল্ট ভাঙার চেষ্টা করে তারা। ব্যাংকের ম্যানেজার নেজামউদ্দিন মসজিদে নামাজ পড়ছিল। মসজিদ থেকে বের হলে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তবে ভোল্ট ভাঙতে পারেনি। পরে গতকাল বুধবার দুপুর ১২টায় পার্শ্ববর্তী থানচি উপজেলায় সোনালি ব্যাংক শাখা ও কৃষি ব্যাংক শাখায় একই সময়ে হামলা করে কেএনএফ। ৩০ জন করে ৬০ জন কেএনএফ এর সশস্ত্র বাহিনী ব্যাংক দুটিতে প্রবেশ করে টাকা নিয়ে যায়। ব্যাংকে থাকা গ্রাহকের মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। কৃষি ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, কৃষি ব্যাংক থেকে ৭ লাখ টাকা এবং কিছু সংখ্যক গ্রাহকের মোবাইল ব্যাংক নেওয়া হয়েছে। সোনালি ব্যাংক থেকেও কয়েক লক্ষ টাকা নিয়ে যায় বলে ব্যাংটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম জানিয়ে বলে, আসলে কত টাকা নিয়ে গেছে, হিসাব মিলিয়ে দেখতেছি। থানচি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, কৃষি ব্যাংক থেকে ৭ লাখ ও সোনালি ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে গেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এলাকাবাসী বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে বিশেষ করে বান্দরবান এলাকায় কুকি চিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। তারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, সরকারি অফিস-আদালত, কৃষি-সব সেক্টর থেকে চাঁদা তুলছে নিয়মিত। এই চাঁদার ভাগ বান্দরবান জেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা নিয়মিত ভাগ পান। এ কারণে কুকি চিনের সঙ্গে তাদের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ি-বাঙালি নেতারা বলেন, সশস্ত্র এই সংগঠনের সঙ্গে তাদের আপোষ করার দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি। যেহেতু তারা পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, খুন-খারাবি করছে, আমাদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। মুরগি নিয়ে বাজারে গেলেও তাদের চাঁদা দিতে হয়। বাঁশ কাটতে গেলেও চাঁদা দিতে হয়। এমন একটি সংগঠনকে আপোষের নামে সুযোগ দেওয়া হলো। এই সুযোগে তারা তাদের কার্যক্রম বেগবান করেছে, গহীন অরণ্যে আস্থানা গড়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রকাশ্যে ব্যাংক লুট করার সাহস দেখিয়েছে। এতে এখন পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বান্দরবানের রুমা এবং থানচিতে ব্যাংক লুটের ঘটনায় কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সার্বিক অবস্থা জানার জন্য গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। আইজিপি বলেন, সকলে সমন্বিতভাবে ব্যাংক ম্যানেজারকে উদ্ধারের কাজ করছি। সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। আমাদের যথেষ্ট সক্ষমতা আছে। কুকি চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের কতিপয় রাজনৈতিক নেতার সখ্যতা রয়েছে। এছাড়া একাধিক সুশিল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাদের যোগসাজস রয়েছে। কারণ তারা নিয়মিত কুকি চিনের কাছ থেকে চাঁদাবাজির টাকার ভাগ পান। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কুকি চিনকে সুযোগ দেওয়া উচিত হয়নি। সুযোগ নিয়ে তারা গহীন অরণ্যে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প করেছে। এখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক হবে। কারণ তারা যেখানে আস্থানা গেড়েছে, সেখানে যাতায়াত করা কঠিন। তারা সব চেনে। ওই সব এলাকায় যেতে এক দুই দিন লেগে যায়। আগে পুরো পাহাড় নিয়ন্ত্রণে ছিল। কুকি চিনের সঙ্গে জেএসএস (মূল), জেএসএস (সংস্কার) ইউপিডিএফ (মূল), ইউপিডিএফ (সংস্কার)ও ইন্ধন যোগায়। বাংলাদেশ থেকে পার্বত্যাঞ্চলকে পৃথক করার ষড়যন্ত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে তাদের সঙ্গে কোন ধরনের আপোষ হওয়া উচিত না। দেশের ৬৩ জেলার মতো এখানেও সরকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সবাই একে অপরের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখে। যারা দেশবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত তারাই হুমকি। বহিঃবিশ্বের কোন কোন দেশ তাদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে। তাদের নির্মূল করতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংক ম্যানেজারের উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযোগ অব্যাহত আছে।
Published on: 2024-04-04 04:21:40.55127 +0200 CEST