ইত্তেফাক
নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

টানা চতুর্থ বারের মতো সরকার গঠন করল আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার ২৫ জন মন্ত্রী ও ১১ জন প্রতিমন্ত্রী গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ গ্রহণ করেন। তাদের শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন ও গোপনীয়তার শপথ নেন। এর মাধ্যমে টানা চতুর্থ বারসহ পঞ্চম বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন শেখ হাসিনা। কোনো নারী হিসেবে পঞ্চম বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নজির গণতান্ত্রিক বিশ্বে এটি প্রথম। প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি তাকে অভিনন্দন জানান। এরপর নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেন। তাদের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলো নতুন সরকারের। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর শেখ হাসিনা তার নতুন সরকার সাজিয়েছেন ১৪ জন নতুন মুখ নিয়ে। সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটের দিকে শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা ও তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতাদের মধ্যে নির্বাচনে জয় পাওয়া ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাম্যবাদী দলের সভাপতি দিলীপ বড়ুয়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে জয় পাওয়া সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, তার ভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমও এসেছিলেন। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সংসদ উপনেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর চাচা শেখ কবীর হোসেন ও চাচাতো ভাই শেখ হেলাল শপথ অনুষ্ঠানে ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত-হাইকমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। শপথবাক্য পাঠ শেষে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চ থেকে নেমে আসেন। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজের আসনে বসে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথগ্রহণ দেখেন। সবাই শপথ নেওয়ার পর শপথ বইয়ে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শপথগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। শপথ অনুষ্ঠান শেষে বঙ্গভবনের মাঠে চা চক্রে যোগ দেন সবাই। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে কথা বলেন। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য বঙ্গভবন বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়। দরবার হলে ১ হাজার ৪০০ আমন্ত্রিত অতিথির বসার ব্যবস্থা করা হয়। নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার মাধ্যমে আগের মন্ত্রিসভা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর আগে দুপুরে নতুন সরকারের ২৫ মন্ত্রী ও ১১ প্রতিমন্ত্রীকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিয়োগ দিয়েছেন। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ মন্ত্রিপরিষদ সচিব এর আগে বুধবার রাতে সচিবালয়ে ২৫ জন মন্ত্রী ও ১১ জন প্রতিমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন। সংক্ষিপ্ত জীবনী :শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হাসিনা ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ও রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালে পরমাণুবিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যখন সপরিবারে হত্যা করা হয়, সে সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান দুই বোন হাসিনা ও রেহানা। পরের ছয় বছর লন্ডন ও দিল্লিতে তাদের নির্বাসিত জীবন কাটে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবেই দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ২১ বছর রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২৩ জুন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এরপর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট আবারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে একই বছরের ১২ জানুয়ারি টানা দ্বিতীয় ও মোট তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিপুল বিজয়ের পর চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নয়, বাংলাদেশ তিনটি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হওয়ার রেকর্ডও শেখ হাসিনার ঝুলিতে। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদে, ১৯৯১ সালে পঞ্চম এবং ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় আওয়ামী লীগ। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনের ঘোষিত ফলাফলে ২২২টিতে জয় পায় আওয়ামী লীগ। এছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা) ১১টি এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি একটি করে আসনে জয় পেয়েছে। ৬২টি আসন পান স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
Published on: 2024-01-12 00:24:21.432708 +0100 CET