ইত্তেফাক
ইসির বক্তব্যের সঙ্গে মিল ছিল না মাঠের চিত্রের

ইসির বক্তব্যের সঙ্গে মিল ছিল না মাঠের চিত্রের

*দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত বক্তব্যের সঙ্গে ভোটের মাঠের চিত্রের কোন মিল ছিলো না। বিএনপিবিহীন এবারের নির্বাচন নিয়ে বরাবরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনাররা। কিন্তু ভোটের দিন ইসির কথার বিপরীত চিত্র ছিলো মাঠে।* কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হলেও ভোটশেষে ভোটের হার ছিলো ব্যাপক। নির্বাচনকে পেশিশক্তির ব্যবহার, কালোটাকার প্রভাবমুক্ত করা যায়নি। গত ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত অনেক ভোটকেন্দ্রের দরজা বন্ধ থাকতে দেখেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। শুধু শেষ এক ঘণ্টায় অর্থাৎ বিকাল ৩টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮৮টি। ওই এক ঘণ্টায় ভোট পড়ার হার ছিলো ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যেখানে মোট ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এছাড়া ইসির ধার্যকৃত ব্যয়সীমারা বহুগুণ বেশি খরচ করেছেন প্রার্থীরা। আবার বেশকিছু আসনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা ছিলেন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। ইসি এবং কয়েকজন প্রার্থীর বক্তব্যে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এমনও দেখা গেছে, একটি ইউপিতে একজন প্রার্থী পেয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার ভোট, পক্ষান্তরে বর্তমান এমপি প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৪৯ ভোট। ইসির কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রকাশের পর ভোটের মাঠের এমন অসংখ্য অসঙ্গতি থাকলেও তা আমলে নেয়নি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। বরং ভোট শেষে বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তের কথা বলা হলেও এবার গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে স্বল্পসময়ের ব্যবধানে। ফলে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, কারও যদি সন্দেহ-দ্বিধা থাকে, ইউ ক্যান চ্যালেঞ্জ ইট এবং এটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। রেজাল্টগুলো আসছে যদি মনে করেন বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম; ওটাকে চ্যালেঞ্জ করে আমাদের অসততা আপনারা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। গত ৬ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছিলেন, নির্বাচনী কাজে নিয়োজিতদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শৈথিল্য, অসততা ও ব্যতয় সহ্য করা হবে না। কিন্তু দেখা গেছে বেশকিছু নির্বাচনি আসনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নিয়ে রাখেন কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। এমন ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-১৪ আসনের বেশকিছু ভোটকেন্দ্রে। একই ঘটনা ঘটে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায়। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার চারঘন্টা আগেই পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়। প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারদের বিরুদ্ধে একজন প্রার্থীর পক্ষে ভোট অনিয়মে সম্পৃক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এজন্য প্রিজাইডিং অফিসার গ্রেফতারও হন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ইত্তেফাককে বলেন, কিছু অনিয়ম, কারচুপির ঘটনা ঘটেছে বলে ভোট শেষে স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বীকার করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক হলো কুষ্টিয়া-২ আসনে ভোটে সব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবে ভোটকারচুপি করে আমাকে পরাজিত করানো হয়েছে। ভোট কারচুপি, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং কালোটাকার প্রভাব থাকলেও কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অনিয়ম তদন্ত ছাড়াই গেজেট প্রকাশ করেছে। জাতির উদ্দেশ্যে  দেওয়া ভাষণে সিইসি আরও বলেছিলেন, নির্বাচনে কোন প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে জাল ভোট অথবা কারচুপির প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক প্রার্থিতা বাতিল করা হবে। তিনি আরও বলেন, কোন প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে জাল ভোট, কারচুপি, ব্যালট ছিনতাই, অর্থের লেনদেন ও পেশিশক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। নির্বাচনে এবার কিছু আসনে কারচুপি হলেও কারোর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়নি। তবে চট্টগ্রাম-১৬ আসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হুমকি দেওয়ায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসনের নৌকার প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু কিছু আসনে ভোটে অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন ধরণের ভিডিও সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলেও কমিশন এ বিষয়ে অভিযুক্ত কারোর প্রার্থিতা বাতিল করেনি। একইভাবে গত ২২ ডিসেম্বর যশোরে খুলনা বিভাগীয় এক বৈঠকে স্বাধীনভাবে ভোট প্রয়োগ করতে সকল প্রকার অনিয়ম, কারচুপি ও দখলদারিত্ব প্রতিহত করতে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। কিন্তু মাঠ প্রশাসন বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এবারের ভোটে প্রভাব বিস্তার করেছেন পেশিশক্তি ও কালোটাকার মালিকরা। ভোটের শেষ একঘণ্টায় প্রায় ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট দেখানো হয়েছে। এই ব্যাপক ভোট দেখানোর কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী শেষ এক ঘণ্টার জন্য পরাজিত হয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টি-জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠের চিত্রের কোন মিল ছিলো না। ভোটের কাস্টিং হার ছিলো অনেক কম। ভোটের কাস্টিং হার বাড়ানোর জন্য এক ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ইসির ভূমিকা পালন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় প্রশাসনকে যেমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তেমন করেই ভোটের দায়িত্ব পালন করেন তারা। গত ২৪ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে সিইসি বলেছিলেন, ভোটের দিন দুই ঘণ্টা পরপর ভোটগ্রহণের হার প্রচার করা হবে। সিইসি আরও বলেন, ভোটকেন্দ্রে কারচুপি বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে ঐ  কেন্দ্রে তাৎক্ষণিক ভোট বা নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু ভোট শুরুর প্রথম দুই ঘণ্টা কোন ধরণের ভোট পড়ার হার বলতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। বরং বেলা সাড়ে ১২টার সময় ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম বলেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট। দুই ঘণ্টা পরপর ভোটের তথ্য না জানানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাইরের তিনটি দেশ থেকে ইসির অ্যাপস হ্যাক করে স্লো করে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ভোটের তথ্য জানাতে সমস্যা হচ্ছে। যদিও ভোট অনিয়মের কারণে ইসি বলছে, তারা ২১টি ভোটকেন্দ্রের ভোট বন্ধ করেছিলো। বেশকয়েকজন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দণ্ডের পাশাপাশি গ্রেফতারও করা হয় সংশ্লিষ্ট ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের। রংপুরে এক বক্তব্যে সিইসি বলেন, মিডিয়াকে কোনভাবেই বাধা দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে বরিশালে এক বক্তব্যে সিইসি বলেছিলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে চলবে না, স্বচ্ছতার প্রতিফলন থাকতে হবে। তবে অনেকস্থানে মিডিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ভোটের পর প্রার্থীদের অভিযোগ :ভোটের পর ভোট অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরাজিত প্রার্থীরা। বরগুনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ভোটে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ দেন ইসির কাছে। মাদারীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুস সোহবান গোলাপ বলেন, অলৌকিক শক্তি কাজ করায় ভোটে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-২ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, এই আসনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। প্রবাসী ও মৃতদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ দেন মানিকগঞ্জ-২ আসনের নৌকার প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম। গাইবান্ধা-১ আসনের জাপা প্রার্থী শামীম পাটোয়ারী জানিয়েছেন, প্রশাসনের মাধ্যমে আমাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপির উৎসব হয়েছে বলে প্রেস ব্রিফিং করে ঘোষণা দিয়েছে কিংস পার্টি নামে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম। ব্যয়সীমার অতিরিক্ত খরচ : নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থীর সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচ করার কথা ছিলো। কিন্তু বিজয়ী প্রার্থীদের অধিকাংশই ইসির নির্ধারিত ব্যয়সীমার বহুগুণ বেশি খরচ করেছেন। এই অতিরিক্ত খরচ মনিটরিং করার জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং ইসির দায়সারা কার্যক্রমে কালোটাকার মালিকরা অবাধে ভোটে মাঠে টাকা উড়িয়েছেন। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার বিধান থাকলেও তা প্রয়োগ করা হয়নি। যদিও ইসির নির্বাচনী ব্যয়সীমাকে প্রার্থীদের কেউ কেউ অবাস্তব বলে আখ্যায়িত করেন। উল্লেখ্য, গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ওই নির্বাচনে ইসির নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগসহ ২৮টি অংশ গ্রহণ করে। বিএনপিসহ সমমনা ১৬টি রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে ২২৩ আসন পেয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ।
Published on: 2024-01-16 02:20:27.024303 +0100 CET