ইত্তেফাক
প্রশাসনের নাকের ডগায় চলে অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক

প্রশাসনের নাকের ডগায় চলে অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক

*সুন্নতে খতনা করাতে রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছয় বছরের শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনাটি দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে গতকাল বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নজরে এসেছে। দেশের সব অনুমোদিত ও অননুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট।* তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বৈধ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তালিকা থাকলেও নেই অবৈধের তালিকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার পর গতকালই অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা প্রণয়ন করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে উপজেলা পর্যন্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।’ এদিকে রাজধানী থেকে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত প্রশাসনের সামনে এবং সরকারি হাসপাতালের চারপাশে অনেক অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। খোদ রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে অর্ধশতাধিক অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। শেরে বাংলা নগরে সরকারি ৯টি হাসপাতালের সামনে ও আশপাশে কয়েক শ অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বিদ্যমান। আর প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে এক ডজনের বেশি অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক চিকিৎসাসেবার নামে গলাকাটা বাণিজ্য করে আসছে। এসব যেন দেখার কেউ নেই। তবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রতি মাসে নির্ধারিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। এ কারণেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়, সিভিল সার্জন কার্যালয় এগুলো দেখেও না দেখার ভান করেন। বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, সারা দেশে বৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ১৫ হাজার। তবে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা তাদের কাছে নেই। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের যে নীতিমালা রয়েছে, তা সবারই মেনে চলা উচিত। তিনি বলেন, সুন্নতে খতনা করাতে রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনাটি সত্যিই দুঃখজনক। এক ডজন সিনিয়র চিকিৎসক ও কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ। দিনদিন এটা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এটা দেখার কেউ নেই। তবে মাস শেষ হওয়ার আগে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা টাকার খাম ঠিকই পান। এ সব অবৈধ ক্লিনিকে চিকিৎসা ও পরীক্ষানিরীক্ষা করাতে গিয়ে অনেক রোগী ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছে, আবার মৃত্যুর সংবাদও পাওয়া যায়। জেনেশুনে ভুল চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হত্যাকাণ্ডের শামিল বলে চিকিৎসকরা দাবি করে বলেন, এতে চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। দেশে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দৌরাত্ম্য-আধিপত্য কমানো যাচ্ছে না কিছুতেই। একটা হাসপাতাল-ক্লিনিক করার জন্য যে সব যন্ত্রপাতি ও জনবল থাকতে হয়, তার বিন্দুমাত্র নেই এসব অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্ট তো দূরের কথা, ভুয়া ডিগ্রির লোকজন দিয়ে অবাধে চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের পরিবেশ অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন ও গোয়াল ঘরের মতো। অপারেশনের প্রয়োজন নেই, তারপরও অপারেশন করা হয়। টাকা নেওয়া হয় দ্বিগুণ। বিভিন্ন সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে অনেক অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে জেল-জরিমানা দিয়েছে। কিন্তু সেখানে তেমন পরিবর্তন আসে না। বরং দিনদিন এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক বাড়ছে বলে মোবাইল কোর্টের একজন কর্মকর্তা জানান। তিনি বলেন, এগুলো কখনো বন্ধ হবে না। যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই তো ভাগ পায়। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।
Published on: 2024-01-16 01:23:54.099018 +0100 CET