ইত্তেফাক
বিএনপির ধীরে চলো নীতি

বিএনপির ধীরে চলো নীতি

*দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে টানা দুই মাস আন্দোলন করেছে বিএনপি। এই সময়ে কখনো একনাগাড়ে হরতাল, কখনো অবরোধ, আবার কখনো একই সঙ্গে হরতাল-অবরোধ দুটিই।* তার আগে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, বিভাগীয় সমাবেশ, রোডমার্চ করে আসছিল বিএনপি। অতপর গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি এবং তার মিত্র জোট ও দলসমূহের বর্জনের মধ্যেই টানা চতুর্থ বার সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্বাচনের পরে নতুন করে আর বড় কোনো আন্দোলন কর্মসূচি নেই। তবে ‘ভোট বর্জন করায়’ বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো এলাকায় সাধারণ মানুষকে লিফলেটসহ ফুল দিয়ে ‘অভিনন্দন’ জানিয়েছেন দলটির নেতারা। এরপর ৩০ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরুর দিনে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু রাজধানীতে অনুমতি না থাকায় পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। এরপর নতুন করে কোনো কর্মসূচি দেয়নি দলটি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, নির্বাচনের পর শরিক ও সমমনা রাজনৈতিক জোটের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি। আন্দোলনের ব্যর্থতা ও নির্বাচনের পর সরকার গঠন হওয়া নিয়ে নানা ধরনের মূল্যায়নও করেছেন বিএনপি ও সমমনা দলের নেতারা। তারা আপাতত ধীরে চলো নীতিতে চলার পক্ষে মতামত তুলে ধরেছেন। কঠোর কোনো কর্মসূচিতে না যেয়ে ‘পরিস্থিতি’ বুঝে সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। দলটির নেতারা মনে করছেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ একতরফা ভোট বর্জন করেছে। এটাকে আন্দোলনের প্রাথমিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন তারা। দলের নেতারা বলছেন, দুই মাসের আন্দোলনে গ্রেফতার, মামলা, হুলিয়ায় সারা দেশের নেতাকর্মীরা পর্যুদস্ত। এখনি বড় আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে তা কার্যকর করার মতো পরিস্থিতি নেই। নির্বাচনের পর ২৭ জানুয়ারি প্রথম সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি, তবে তাতে দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম ছিল। মামলা এবং গ্রেফতার এড়াতে এখনো অধিকাংশ কেন্দ্রীয় এবং জেলা ও মাঠ পর্যায়ের নেতারা আত্মগোপন থেকে বের হতে পারেননি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বহু নেতা কারাগারে। তাদের জামিন হচ্ছে না। এই মুহূর্তে আন্দোলনে থাকলে নেতাদের জামিন অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে আসা শুরু করেছেন। প্রতিদিন জামিনের জন্য হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ রীতিমতো জনসমাবেশের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিম্ন আদালতেরও অবস্থা তথৈবচ। বিএনপির এখন ব্যস্ততা লক্ষাধিক নেতাকর্মীর জামিন নিয়ে। জামিনের পরে পরিস্থিতি বুঝে আন্দোলনের পথরেখা নিয়ে অগ্রসর হতে চাচ্ছে। ইত্যবসরে কূটনৈতিক চ্যানেলে সরকারের বিরুদ্ধে লবিং জোরদার করা এবং ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা বলছেন নেতারা। বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর জানিয়েছে, গত ২৮ জুলাই থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ছয় মাসে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মোট ২৭ হাজার ৫২৬ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। এই সময়ে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৯২টির অধিক। যাতে মোট আসামি করা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ১৬৩ জন। এছাড়া গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে বিএনপির মহাসমাবেশ এবং তারপর থেকে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির আন্দোলন চলাকালে গত দুই মাসে ২৫ হাজার ৬৪৪ জনের বেশি নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে কারারুদ্ধ হয়েছেন। দুই মাসে মোট মামলা হয়েছে ৭৯০টির অধিক। যাতে আসামি ৭৮ হাজার ২১০ জন। আন্দোলনের দুই মাসে মারা গেছে ৩১ জন নেতাকর্মী। আন্দোলন করতে গিয়ে আহত হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৫ জনের অধিক নেতাকর্মী। মোট ৮৪টি মামলায় বিএনপির ৯ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশও প্রায় ১ হাজার ২৯৪ জনের অধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। ১৫ নভেম্বর নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৩০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে। এই সময়ে ৫১৯টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫৩ হাজার ৭৮১ জনের অধিক নেতাকর্মীকে। গত ২০ ডিসেম্বর বিএনপি অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষনা দিয়ে মামলার আসামি নেতাকর্মীদের আদালতে হাজিরা না দেওয়ার ঘোষণা প্রদানের পর গণহাজিরা অনেকের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। ফলে এখন তারাও আদালতে ছুটছেন। এই লক্ষাধিক নেতাকর্মী এখন তাদের মামলার তারিখ এবং জামিন নিয়ে সময় পার করছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, যে কৌশলই আমরা নিচ্ছি সেখানে বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন থাকবে। মানুষ হয়তো প্রত্যাশা করেছিল এই সরকার বিদায় নেবে। কিন্তু বিদায় তো নেয়নি। কিন্তু এটাও ঠিক একটা স্বৈরাচারী সরকারকে বিদায় দেওয়া এটা তো সহজ কোনো সংগ্রাম নয়। এটা কঠিন এবং অনেক সময় দীর্ঘ সময় লাগে। বিএনপি সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত আমাদের আন্দোলনের একটা পর্যায় ছিল। এখন আমরা একটা নতুন পর্যায়ে যাব। তিনি বলেন, ‘আমরা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা-বিশ্লেষণ করছি। অবাস্তব বা কল্পিত চিন্তার মাধ্যমে আন্দোলনকে পরিচালিত না করে, এখনকার বাস্তবতাকে নিয়েই আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা হবে।’ ড. মঈন খান বলেন, ‘আমরা নির্বাচন ঠেকাতে পারিনি এটা সত্য, তবে এ দেশের ১৮ কোটি জনগণ ও ১২ কোটি ভোটারের মন ঠিকই জয় করতে পেরেছি। এখন আমরা কৌশলে অগ্রসর হতে চাই। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, আন্দোলন নিয়ে হতাশা নেই দলের ভেতর। বিএনপিকর্মী এবং সমর্থকনির্ভর দল। ভোট বর্জনের আন্দোলন হয়েছে। জনগণ ভোট বর্জন করেছে। যেখানে জনগণ আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ভোটে যায়নি। তিনি বলছেন, এখন নেতাকর্মীদের জামিন এবং কারামুক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীরা কারামুক্ত হলে শিগিগরই স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসবে। বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল বলেন, ‘২৮ অক্টোবরের পর থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত বহু মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সময়ে, ২৭ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জামিনের জন্য আমরা কাজ করছি।’ দলের একজন নেতা জানান, আগামীতে নেতাকর্মীরা কারামুক্ত হলে তাদের জেলায় জেলায় বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হতে পারে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, সামনে কী ধরনের পরিকল্পনা নেব, দলের কৌশল আমরা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত হবে।
Published on: 2024-02-02 22:12:39.337746 +0100 CET