ইত্তেফাক
সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি, উচ্চ মূল্যে বেসরকারিতে পরীক্ষা

সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি, উচ্চ মূল্যে বেসরকারিতে পরীক্ষা

*সরকারি হাসপাতালে সারা বছরই যন্ত্রপাতি কেনার ধুম পড়ে। যা প্রয়োজন নেই, তা-ও কেনা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষানিরীক্ষার অনেক যন্ত্রপাতি আছে। তবে এসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার খুবই কম হয়। টেকনিশয়ানের অভাবে অনেক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। আবার জনবল থাকলেও পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় উচ্চমূল্যের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।* অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহূত ও অযত্ন-অবহেলা অবস্থায় পড়ে থাকে। এতে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষানিরীক্ষাসহ সব সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই সুবিধা থেকে রোগীরা বঞ্চিত। প্রায় ৯০ ভাগ রোগীর পরীক্ষা করা হয় না উপজেলা স্বাস্থ্য কমেপ্লক্সে। রাজধানী, ঢাকা শহর, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরে বেশির ভাগ রোগী বাইরে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় যন্ত্রপাতি নষ্ট বলে। বেসরকারি ঐ সব ক্লিনিক থেকে এক শ্রেণির ডাক্তার রোগী পাঠানোর নামে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কমিশন পান। এ বাণিজ্য এখন ওপেন। স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন রবিবার ঝটিকা অভিযানে যান রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি)। যেখানে অনেক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি ও নানা অনিয়মের দৃশ্য নিজেই দেখতে পান। এই মেডিসিন স্টোরেজ থেকে সারা দেশে সব সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও ওষুধসামগ্রী বেশির ভাগ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষও ক্রয় করে থাকেন। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণ আগামী সাত দিনের মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সরকারি হাপসাতালে কোটি কোাটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। আলোচিত মিঠু ঠিকাদারের কাজ ছিল কেনাকাটা। কেনাকাটা যেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তার কাজই ছিল। প্রয়োজন নেই, তারপরও কেনা হয়েছে। এর সঙ্গে সাবেক ও বর্তমান অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা জড়িত। কোনো কোনো হাসপাতালে এক্সরে, প্যাথলজি পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাফি, ল্যাপারোস্কপি, স্টেরিলাইজার, অটোক্লেভ, ডায়াথামিসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। এসব কারণে রোগীরা পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বছরের পর বছর। অন্যদিকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণরত এফসিপিএস, এমডি, এসএমসহ উচ্চতর কোর্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি চক্র যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করে। তারা সব সময় যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যস্ত থাকে। আর যারা কেনাকাটায় দুর্নীতি করছে, তারাই জনবল নিয়োগে জটিলতার সৃষ্টি করছে। রবিবার দুপুরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলমকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে ঝটিকা অভিযানে নেতৃত্ব দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রায় ৩৫ মিনিট পুরো স্টোরেজ ঘুরে দেখেন এবং সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ সময় সেখানে শত শত কার্টনভর্তি যন্ত্রপাতিসহ নানা ধরনের জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসামগ্রী অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। ঐ সময় মন্ত্রী অনিয়ম স্বচক্ষে দেখতে পান। অনেক জরুরি পণ্য অব্যবহূত অবস্থায় সেখানে মেয়াদ শেষ হয়ে গেল কীভাবে, তা উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অধিকাংশ প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারেননি উপস্থিত কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব অনিয়ম দেখে এই স্টোরেজের সব মালামালের তালিকাসহ, কোন মালামাল কত তারিখে ডেলিভারি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোন পণ্য কবে ডেলিভারি করা হবে, সেগুলোসহ, কেন এত বিরাটসংখ্যক মালামাল নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, তার কারণ জানতে চান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ বি এম খুরশীদ আলমকে এই প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে সংগ্রহ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে একটি জরুরি বৈঠকে বসার নির্দেশনা দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন ইত্তেফাককে বলেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান দেশব্যাপী চলবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে। জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে মন্ত্রী জানান।
Published on: 2024-02-27 02:12:44.012847 +0100 CET