ইত্তেফাক
বাড়ি ছাড়ছেন সীমান্তের বাসিন্দারা, ৬ স্কুল বন্ধ

বাড়ি ছাড়ছেন সীমান্তের বাসিন্দারা, ৬ স্কুল বন্ধ

*মিয়ানমারে আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যাপক গোলাগুলিতে আতঙ্কে আছেন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তবর্তী এলাকা বাসিন্দারা। সংঘর্ষের সময় সীমান্তের ওপার থেকে গুলি ও মর্টারশেল বাংলাদেশে আসায় জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু, কোনারপাড়া, ভাজাবনিয়া ও বাইশফাঁড়ি এলাকার শত শত পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তের ১০০ গজ দূরত্বে থাকা মিশকাতুন নবী দাখিল মাদরাসাসহ সীমান্ত এলাকার ৫টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।* জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল মান্নান বলেন, আজ (রোববার) সকাল থেকে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার অভ্যন্তরে গোলাগুলি বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্ত এলাকার বাইশ ফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজা বনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম কুল তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ গুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর সংঘাত চলছে। এতে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক। এসব গোলাবারুদ আর বিস্ফোরকের বিকট শব্দে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এদিকে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে প্রবীর ধর নামে এক বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। আজ সকালে নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে শনিবার থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত মিয়ানমারের ছোঁড়া দুটি মর্টার শেল ও একাধিক গুলি এসে পড়েছে তুমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছে অনেকে। যদিও সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘর্ষ ও উত্তেজনায় বিজিবির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়। আজ সকালে বিদ্রোহীদের সঙ্গে প্রচণ্ড গোলাগুলির মুখে বাংলাদেশের বান্দরবানে প্রবেশ করে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ১৪ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ। আজ রোববার সকাল ৮টার দিকে তারা বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তে প্রবেশ করে বিজিবির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। বিজিবির ৩৪, টেকনাফ ব্যাটালিয়ন প্রধান লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি বিজিবির সেক্টর ও বিজিবি সদর দপ্তরের জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তমব্রু এলাকাবাসীরা শনিবার রাত থেকেই মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। অনেকেই প্রাণ ভয়ে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এরই মধ্যে সকালে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা থেকে ছোঁড়া গুলিতে তমব্রু এলাকায় একজন বাংলাদেশী গুলিবিদ্ধ হন। সকাল ৮ টার দিকে ১৪ জন বিজিপি সদস্য তমব্রু এলাকায় প্রবেশ করে বিজিবির আশ্রয় চায়। এরপরই তাদেরকে বিজিবির তমব্রু ক্যাম্পে নিরাপদ হেফাজতে নেয় বিজিবি। ধুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. আলম বলেন, শনিবার সন্ধ্যা থেকে যে পরিমাণ গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে আগে তেমনটা শোনা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে ঘর থেকে বের ভয় পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। শনিবার দিবাগত রাত ও রোববার সকালে তুমব্রুর কোনারপাড়ার ইলিয়াস হোসেনের বসতঘরের টিনে পড়েছে মর্টার শেল। তবে কেউ হতাহত হয়নি। আশরাফুল ইসলাম তুহিন নামে স্থানীয় এক যুবক বলেন, আমাদের ২ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলামের উঠানে একটি মর্টার শেল এসে পড়ছে। এ ছাড়া আশপাশে আরও বেশ কিছু গুলি এসে পড়ে এলাকায়। ওপারে এখনও সংঘর্ষ চলছে। আমরা ভয়ে বাড়িঘর থেকে বের হতে পারতেছি না। কোনাপাড়া ও পশ্চিমপাড়া অনেক লোকজন সেখান থেকে বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে। তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে থেমে থেমে যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলা ও মর্টার শেল নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তের লোকালয়ে এসে পড়ছে। এর আগেও মর্টার শেল ও গুলি এসে পড়েছে এই এলাকায়। এ ছাড়া টেকনাফের উলুবনিয়ায় মর্টার শেল এবং উখিয়ার পালংখালীর বটতলী এলাকায় গোলার ভাঙ্গা অংশ এসে পড়ে। এর আগেও মর্টার শেল ও গোলার অন্তত চারটি অংশ নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু, কোনারপাড়া ও পশ্চিম ঘুমধুমে এসে পড়ে। বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন ও পুলিশ সুপার সৈকত শাহিন ঘুমধুম সীমান্ত পরিদর্শন করেন। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, মিয়ানমারে এখনো প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছি আমরা। এবার গোলাগুলির শব্দের তীব্রতা বেশি হওয়ায় সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এদিকে উখিয়া এবং টেকনাফ সীমান্তে রাতে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা গেলেও সকাল ৯টার দিকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পায় স্থানীয়রা। টেকনাফ হোয়াইক্যংয়ের বাসিন্দা ও গণমাধ্যম কর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাতে থেমে-থেমে গুলির শব্দ শোনা গেলেও সকাল ৯টার দিকে ব্যাপক গুলির শব্দ ভেসে আসে। ফলে সীমান্ত এলাকায় আবারও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের সীমান্তে থেমে-থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তবে বরাবরের মতো রোহিঙ্গা এবং বিদ্রোহীরা যেন আমার দেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে। বরাবরের মতোই সীমান্তে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঘিরে সতর্ক অবস্থানে আছে বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একজন রোহিঙ্গাকেও আর প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
Published on: 2024-02-04 10:13:16.096605 +0100 CET