ইত্তেফাক
প্রশাসনের নমনীয়তায় বেপরোয়া ছাত্রলীগ!

প্রশাসনের নমনীয়তায় বেপরোয়া ছাত্রলীগ!

*একের পর এক চাঁদাবাজি, ছিনতাই, নারী নিপীড়ন ও মারধরসহ নানা অপরাধে আলোচনায় এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রলীগ। এবার সংবাদের শিরোনাম ‘ধর্ষণকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের চার নেতাকর্মী আটক। তবে ইতিপূর্বে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থামছে না, বরং ছাত্রলীগ বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।* শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘মানবিকতা’ দেখায়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা চালায়। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধ বাড়ছে। গণরুম-গেস্টরুম কালচার বন্ধ না করা এবং বিভিন্ন সময়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না করাই ‘ধর্ষক’ মোস্তাফিজের জন্ম দিয়েছে। চাঁদাবাজি ও মারধর: অভিযোগ আছে, গত বছরের ১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী পানধোয়া এলাকার ডিশ ব্যবসায়ী মমিনউল্লাহ মমিনের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ত্রাণ ও দুর্যোগবিষয়ক সম্পাদক শান্ত মাহবুব এবং উপদপ্তর সম্পাদক হাছিবুর রহমান। টাকা না পেয়ে লাইনম্যান খায়রুলকে ক্যাম্পাসে এনে মারধর করেন তারা। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। এরপর ৫ মে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাব্বির হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী ইসলামনগর বাজারে এক জুতার দোকানদার ও তার কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীকেও মারধর করেন তারা। একই বছরের ২৫ জুলাই সাভার থেকে আশুলিয়া রুটে চলাচলকারী লেগুনা থেকে দৈনিক ২৫ টাকা হারে চাঁদা দাবি করে ২৪টি লেগুনা ক্যাম্পাসে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল ফারুক ইমরান, শাহ পরাণ ও হাসান মাহমুদ ফরিদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, লেলিন মাহবুব ও উপছাত্রবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক আল-রাজি সরকারের বিরুদ্ধে। সে সময় লেগুনা মালিকদের থেকে ছাত্রলীগের এক নম্বর সহসভাপতির চাঁদা আদায়ের ভিডিও ভাইরাল হয়। এছাড়া গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক অসিত পালের বিরুদ্ধে নেশাদ্রব্য খাইয়ে বাসে উঠিয়ে ঢাকার খিলগাঁও থেকে এক বহিরাগতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাম-বরকত হলে এনে বেধড়ক মারধরের পাশাপাশি ৪৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। পরে অসিত পালকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এদিকে গত বছরের ১৬ মে সায়েম হাসান নামের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী কানে অস্ত্রোপচার করায় ছাত্রলীগের গেস্টরুমে যাননি। এ কারণে শহিদ সালাম-বরকত হলের পলিটিক্যাল ব্লকে ডেকে নিয়ে তাকে হল ছাত্রলীগের নেতারা মারধর করেন। এছাড়া গত বছরের জুলাইয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে নিজের গাড়িতে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগে কিছু শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। পরে নিরাপত্তা শাখার কাছে হস্তান্তর করে এবং ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে তিন দিন পর অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেন। এছাড়া ঐ মাসে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ছয় নেতার বিরুদ্ধে এক বহিরাগতকে তুলে নিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এদিকে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে শাখা ছাত্রলীগের কয়েক জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ দেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মামুনুর রশিদ। তবে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে না ডেকেই অভিযোগ গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মামুনুর রশিদ বলেন, ‘আমি মারধরের বিচার চেয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেই। তবে প্রথমে প্রক্টর অভিযোগটি আমলে নিতে চাননি। পরে নিজের হলের একজন নেতাকে দিয়ে বিষয়টি সমঝোতা করার চেষ্টা করেন তিনি। আমি তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় অভিযোগটি গায়েব করে দেন প্রক্টর।’ ছাত্রলীগের নারী নিপীড়ন :বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বহিরাগত নারীকে শারীরিক হেনস্তার ডজন খানেক ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও অধিকাংশ সময়েই পার পেয়ে যান অভিযুক্তরা। জানা যায়, ২০১৫ পয়লা বৈশাখের দিন আদিবাসী এক ছাত্রীকে যৌন হেনস্তা, ছিনতাই ও মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। যারা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত এক নারীকে ইভটিজিংয়ে বাধা দেওয়ায় এক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত ও এক সংবাদকর্মীকে মারধরের অভিযোগে ছাত্রলীগের পাঁচ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে এক শিক্ষার্থী ও তার বান্ধবীর কাছে চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় মারধর ও ধর্ষণের হুমকি দিয়ে কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ছাত্রলীগের তিন জনকে আজীবন এবং দুজনকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এদিকে ২০২৩ সালের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসে ছিনতাইয়ের শিকার হন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই নেতাকর্মী জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর আগে, ২০২২ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই কর্মীর বিরুদ্ধে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও আরেক নারী শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। দুই হলে ‘টর্চার সেল’ : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৫ বছর আগে ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের ছোট ভাই আরমান খান যুব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মওলানা ভাসানী হলের ১২৬ নম্বর কক্ষে থাকেন তিনি। কক্ষটিকে তিনি ‘টর্চার সেল’ বানিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে প্রায়ই বাইরে থেকে লোক ধরে এনে মারধর করা হয়। সেখানে আছে মাদক কারবারের অভিযোগ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগে যুবর টর্চার সেলের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের আহ্বায়ক আলিফ মাহমুদ বলেন, ‘এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ না। কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ক্যাম্পাস না দিতে পারার কারণ তাদের বিচারহীনতা।’ এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘বৃহত ছাত্র সংগঠন হওয়ায় প্রতিটি সদস্যের বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদারকি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এরই সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু লোক বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। যার কারণে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ভবিষ্যতে বেশি বেশি কাউন্সেলিং ও কর্মিসভার মাধ্যমে শাখা ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখব।’ সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘ছাত্র শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রক্টরিয়াল বডি সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা সেটার তদন্ত করি এবং ব্যবস্থা নিই।’ প্রতিবাদ অব্যাহত: এদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত এক দম্পতিকে কৌশলে ডেকে এনে স্বামীকে আবাসিক হলে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় ধর্ষণ ও নিপীড়ন মুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার সংলগ্ন সড়কে ‘নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চের’ ব্যানারে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা। এতে দেড় শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা অছাত্রদের হল থেকে বের করা, ধর্ষণে অভিযুক্ত অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি কার্যকর করা, ভিন্ন ঘটনায় যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনির শাস্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল হাসান এবং মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাব্বির আলমের পদত্যাগের দাবি জানান। অন্যদিকে ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে মৌন মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে মিছিলটি বের করা হয়। মিছিলটি মূল সড়ক দিয়ে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এছাড়া সন্ধ্যায় চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য একদল শিক্ষার্থী।
Published on: 2024-02-06 21:47:39.082203 +0100 CET